• শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

একজন হিরোর বিদায়

  শাকিল রেজা, মেহেরপুর

৩০ জুলাই ২০২০, ১৪:১৯
মুজিবনগর
মুজিবনগরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার উসমান গনি

মুজিবনগরের হাজারো মানুষকে কাঁদিয়ে সকলের মাঝে থেকে বিদায় নিচ্ছেন মুজিবনগরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার উসমান গনি।

করোনা কালীন সময়ে নিজের জীবন ঝুঁকি রেখে সব সময় সাধারণ জনগণের সেবায় নিয়োজিত থেকে নিজের সৃষ্টিশীল কাজ আর উদ্যোমী মানবিক চরিত্রের মাধ্যমে এরই মধ্যে তিনি উপজেলা বাসীর মন জয় করেছেন ।

যা মানুষের মন থেকে কখনো হারিয়ে যাওয়া সম্ভব না। সব সময় মনে রাখবে মুজিবনগর বাসী। উসমান গনির মত এমন একজন জনমানবদরদী হিরো মানুষকে হারাতে বসেছে মুজিবনগর উপজেলা বাসি।

উসমান গনি গত বছরের জুলাই মাসের ৩১ তারিখে মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসাবে যোগদান করেন। আজ তার মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসাবে ১ বছর পার হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে তিনার বদলির অর্ডার চলে এসেছে। মাত্র এক বছরেই মুজিবনগরে হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয়। যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। আর সবগুলো সমস্যা অতিক্রম করেই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সব সময় যোগাযোগ রেখেছে নিচু শ্রেণির মানুষদের সাথেও। কখনো কাউকে আলাদা চোখে দেখেননি তিনি।রাত দিন বলে ছিলোনা কোন পার্থক্য।

তবে পদোন্নতি পেয়ে বদলিজনিত কারণে তাকে মুজিবনগর ছাড়তে হচ্ছে। যাচ্ছেন গোপালগঞ্জ এর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসাবে।

ইতিমধ্যে তার বদলির অর্ডার চলে এসেছে, যে কোন সময় যেতে হতে পারে মুজিবনগর ছেরে অনেক দুরে। কিন্তু এটা কখনই মেনে নিতে পারছে না উপজেলাবাসি। একজন ইউএনও হিসাবে তার কাজের বাইরেও মানবতার দিক থেকে তিনি অনেক কাজ করেছেন যাতে পাল্টিয়েছি অনেকের জীবন ও দুঃখ দুর্দশা।

তিনি একজনকে গাঁজা খাওয়ার অপরাধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা দিতে গিয়ে সাজার পরিবর্তে দিয়ে এসেছে ঘর। এতে তিনি হয়েছিলেন জনগণের কাছে অনেক আলোচিত একজন মানুষ। এছাড়া তিনি মুজিবনগর উপজেলার রতনপুর গ্রামের একজন প্রতিবন্ধী মানুষের মেয়ের সকল পড়াশুনা করানোর দায়িত্বও নিয়েছিলেন নিজের মানবতার দিক থেকে। তিনি একটি বারও ভাবেননি মুজিবনগর থেকে চলে যাওয়ার পর তিনি কিভাবে ঐ মেয়ের পড়াশুনার খরচ চালাবেন।

এতবড় দায়িত্ব নিয়ে তিনি আরেক মানবতার পরিচয় দিয়েছিলেন। যা পরবর্তীতে মেসডা নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউএনওর কাছ থেকে মেয়েটির সকল পড়াশুনা করানোর দায়িত্বটা বুঝে নেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার উসমান গনির এমন মহৎ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে রতনপুর গ্রামের মাইকেল মণ্ডল জানান, আমার মেয়ে মেঘলা মণ্ডল। সে এবার বাগোয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সাইন্স থেকে (এ+) পেয়েছে। আমার মেয়ের স্বপ্ন সে একদিন অনেক বড় হয়ে আমাদের কষ্ট ঘুচাবে। কিন্তু আমি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ হয়ে আমার মেয়ের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারছিলাম না। তাই আমার মেয়েকে নিয়ে একদিন ইউএনও স্যারের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমার ঘটনা শোনার পর আমার মেয়ের পুরো পড়াশুনার দায়িত্ব নেন। যেটা আমি কখনোই ভুলতে পারবো না। তবে তিনার বিদায়ের কথা শুনে খুব কষ্ট লাগছে। তবে সব সময় দোয়া করবো তিনি যেখানেই থাকুক তিনি ভালো থাকুক। তিনিই আমাদের হিরো।

এদিকে ইসলাম শেখ(বিহারী) জানান, আমাকে কোন এক কারণে ইউএনও স্যার জরিমানা করতে এসেছিলো। কিন্তু তিনি আমার ঘরবাড়ি দেখে তিনার মানবতার দিক থেকে আমাকে সাজা না দিয়ে একটি ঘরের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি আমাকে পরিবর্তন করতে সাহায্য করেছেন। ইউএনও স্যারের মত লোক হয়না।

গৌরীনগর গ্রামের স্কুল শিক্ষার্থী ও মুজিবনগর কোভিড-১৯ ভলেন্টায়ার সদস্য সাবিরিন রহমান জানান, উসমান গনি স্যারের মত একজন একটিভ অফিসার এর আগে দেখিনি। তিনি কখনো অলসতা দেখান নি। স্যারের কাছে যে কোন সমস্যা নিয়ে গেলে তিনি সাথে সাথেই সেই সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করেছেন।তাছাড়া আমি ভলেন্টিয়ার হিসাবে স্যারের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। যে কোন প্রয়োজনে স্যার আমাদের সব সময় সহযোগিতা করে এসেছেন। মুজিবনগরের মত জায়গায় এমন একজন একটিভ অফিসার থাকায় মুজিবনগর আগের থেকে অনেকটা চেঞ্জ হয়ে গেছে। তবে স্যারের বদলির খবর শুনে খুব খারাপ লাগছে।

মুজিবনগর উপজেলার অনেকেই জানান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার উসমান গনি মুজিবনগরের মানুষের জন্য যা করেছেন এর আগের কোন ইউএনওকে এরকম ভাবে কাজ করতে দেখিনি। তিনি সাধারণ মানুষের মনের ভিতর ঢুকে পরেছিলেন। উসমান গনি স্যারের মত একজন সৎ অফিসার পাওয়া সত্যিই একটা ভাগ্যের ব্যাপার।স্যার মুজিবনগর থেকে চলে গেলে আমার একজন ভালো অভিভাবক হারাবো। তার কাজ কর্ম মুজিবনগরের জন্য একটি সৃতি হয়ে থাকবে।

মুজিবনগরের হাজারো মানুষকে কাঁদিয়ে বদলি হয়ে চলে যাওয়ার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার উসমান গনির অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, স্বাধীনতার সৃতিকাগার ঐতিহাসিক মুজিবনগরের মত জায়গায় চাকরি করা একটি সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমি এই জায়গায় একজন ইউএনও হিসাবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। মুজিবনগরের মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকসহ সকলেই অনেক ভালো। তারা সকলেই আমাকে সবসময় সহযোগিতা করে এসেছি।

সবচেয়ে বড় গর্ভের বিষয় হলো মেহেরপুর জেলায় একজন প্রতিমন্ত্রী আছেন। যিনি মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্বে আছেন। তিনি সব সময় মুজিবনগরের উন্নয়নের কথা ভাবেন। সব সময় ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। ভালো কাজ করার মত একটি সুন্দর পরিবেশ তিনি তৈরি করে দিয়েছেন। এখানে চাকরি করতে এসে এখানকার মানুষের জন্য আমার মনে অন্য ধরনের একটি মায়া জন্মে গেছে। সকলকে ছেড়ে, মুজিবনগর ছেড়ে চলে যেতে আমারও খারাপ লাগছে। তবে একজন সরকারি চাকরিজীবী সারাজীবন এক জায়গায় থাকতে পারে না। সরকারের নিতিমালা অনুযায়ী সকলকেই বদলি হতে হবে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
nite
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
jachai

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড