• সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

লঞ্চ দুর্ঘটনায় মুন্সিগঞ্জে লাশের মিছিল, স্বজনদের আহাজারি

  মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি

২৯ জুন ২০২০, ২১:১২
মুন্সিগঞ্জ
স্বজনদের আহাজারি

মুন্সিগঞ্জে মিরকাদিমের কাঠপট্টি ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী মর্নিংবাড লঞ্চটি শতাধিকের উপরে যাত্রী নিয়ে সদরঘাট এলাকার ফরাশগঞ্জে ডুবে যায়। 

সোমবার (২৯ জুন) সকাল সোয়া ৯ টার দিকে ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় যারা হতাহত হয়েছে এ পর্যন্ত সবাই মুন্সিগঞ্জ বাসিন্দা বলে জানাযায়। 

ঘাট, স্থানীয় এবং দুর্ঘটনা থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা বলছেন লঞ্চটির মধ্যে যারা ছিলেন অধিকাংশই সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভা, রামপাল, ও বজ্রযোগনি ইউনিয়নের বাসিন্দা। এছাড়াও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আব্দুল্লাহপুর, কামারখাড়া, হাটকান ও দিঘীরপাড় এলাকার মানুষ রয়েছেন।

দুর্ঘটনা থেকে উদ্ধার হওয়া যাত্রী, নিহতের স্বজন এবং স্থানীয়রা বলছেন, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ,অতিরিক্ত যাত্রী, অদক্ষ লঞ্চ চালক ও ময়ূর-২ লঞ্চের চালকের গাফলতির কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

কাঠপট্টির লঞ্চঘাট এলাকার স্থানীয়রা জানান, ১০০ জনের বেশি যাত্রী নিয়ে সোমবার সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটের দিকে লঞ্চটি ঢাকার উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করে। এ লঞ্চে করে প্রতিদিন তারা ঢাকায় যাতায়াত করেন। লঞ্চটির ফিটনেস নেই। ধারণ ক্ষমতার বেশি যাত্রী নিয়ে চলাচল করে। প্রায় সময় ছোট ছোট দুর্ঘটনার স্বীকার হয়েছে।

দুর্ঘটনা থেকে জীবিত ফিরে আসা জাহাঙ্গীর হোসেন নামে একজন জানান, তার বাড়ি মুন্সিগঞ্জের মিরকামি পৌরসভার এনায়েত নগরে।রাজধানীর বঙ্গবাজারে কাপড়ের দোকানে কাজ করেন তিনি ।গত ৮ বছর ধরে কাঠপট্টি থেকে লঞ্চে করে ঢাকায় আসা যাওয়া করেন । জাহাঙ্গীর বলেন, সোমবার সকাল পৌনে ৮ টায় প্রতিদিনের মতই মর্নিং বার্ড লঞ্চে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। তার সাথে মিরকাদিম পৌর এলাকার প্রায় ১০ জন যাত্রী ছিলেন। কথা,আড্ডায় তারা লঞ্চটিতে মেতে ছিলেন। ফরাশগঞ্জ ঘাট এলাকার কাছে গেলে সকাল সোয়া নয়টায় ময়ূর-২ তাদের লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়। এসময় লঞ্চটি একপাশে কাত হয়ে যায়। পাশের সবাই ছিটকে নদীতে পড়তে থাকেন। সেও লঞ্চ থেকে পানিতে পড়ে যায়।  ১০-১২ জন যাত্রী তার উপরে পড়ে। তার সামনেই অনেকে ডুবে যান। সেও প্রায় ডুবে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যে কোন রকম সাতরে তীরে উঠেন তিনি।

জাহাঙ্গীর বলেন,যাদের সাথে ৫ মিনিট আগেও প্রাণবন্ত আড্ডায় ছিলাম। চোখের সামনে তারা ডুবে গেলেন। এটা কতটা কষ্টের ভাষায় বোঝানো যাবেনা।

কামারখাড়া এলাকার মজিবুর শিকাদার বলেন, মা ও ভাইকে নিয়ে ঢাকার শেওরাপাড়া এলাকায় বোনের বাসায় যাচ্ছিলাম। আমি ও ছোট ভাই হাবিবুর রহমান শিকদার লঞ্চের ওপরে ছিলাম এবং আমার মা লঞ্চের কেবিনে ছিলো।  হঠাৎ একটি লঞ্চ পিছন থেকে ধাক্কা দিলে মূহুর্তেই আমাদের লঞ্চটি ডুবে যায়। এসময় ছোট ভাই ও আমি সাঁতার কেটে নদী পাড়ে উঠতে পারলেও  মা কেবিন থেকে বের হতে পারেনি। পরে মৃত অবস্থায় মায়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ওমর চান নামে আরো একজন বলেন, ময়ূর-২ লঞ্চটি সামনের অংশ দিয়ে মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দেয়। সাথে সাথেই মর্নিংবার্ড উল্টে যাচ্ছিল। তিনি জীবন বাঁচাতে পানিতে লাফিয়ে পরেন।তার সাথে আরো কয়েক জন ছিলেন। অনেকে পানির নিচ থেকে টেনে ধরে ছিলেন কোন রকমে প্রাণে রক্ষা পান। তিনি এক নারীকেও  ওই ঘটনা থেকে উদ্ধার করেন।

ফকির চাঁন নামে আরো একজন জানান, ঢাকায় জমুনা ব্যাংকে চাকরি করেন। তিনি ও তার সাথে আরো একজন লঞ্চে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। তিনি লঞ্চ বিকট একটি শব্দ শুনতে পেলেন। মুহূর্তেই লঞ্চটি পানিতে চলে গেল। পানিতে ডুবন্ত অবস্থায় সূর্যের আলো দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি কোন রকমে সেখান থেকে বেড়িয়ে আসেন।তবে তার সাথে থাকা ওই ব্যাক্তি নিখোঁজ আছে।

দুর্ঘটনা থেকে ফিরে আসা নাজমা আক্তার, জুমকি, কাকলি বেগম ও মমিন আলীরাও জানান দুর্ঘটনা থেকে ফিরে আসার কথা। মৃত্যুকে এত কাছ থেকে এর আগে তারা কেউ দেখেননি।

নাজমা আক্তার বলেন,তিনি  চিকিৎসা নেওয়ার জন্য ঢাকায় যাচ্ছিলেন। লঞ্চটি যে পাশ দিয়ে ডুছিল তার বিপরীত পাশের জানালা দিয়ে বেড়িয়ে আসেন তিনি। তিনি বলেন,চোখের সামনে পরিচিত মুখ গুলো মুহূর্তে লাশ হলো। এমন ঘটনা সহ্য করা যায়না।

এ সময় তারা বলেন,ছোট একটা লঞ্চে ১০০ থেকে ১১০ জনের বেশি যাত্রী ছিল। প্রতিদিনই ধারণ ক্ষমতার বেশি যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি ঢাকায় আসে। এর আগেও লঞ্চটি ছোট ছোট দুর্ঘটনার স্বীকার হয়। কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। আজকে এতো বড় ঘটনা ঘটলো।

কাঠপট্টির লঞ্চঘাট এলাকায় রামপাল ইউনিয়নের শাখারি বাজার এলাকার গোলাপ হোসেন বলেন, তার ১০ বছর বয়সী ছেলে তামিমের কিডনিতে সমস্যা। চিকিৎসার জন্য তার স্ত্রী ও শ্বশুর ওই লঞ্চে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার খবর  পেয়ে স্ত্রী,শ্বশুরের ফোনে চেষ্টা করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। দুপুর আড়াইটার দিকে তিনি জানতে পারেন সবাই মারা গেছেন।

এসময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন,যদি জানতাম ছেলেকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে সবাইকে হারাবো তাহলে কোন দিনও পাঠাতাম না।

মো. আনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যাক্তি বলেন, তার ভাগিনা ফাহিম, তার স্ত্রীর ভাই গোলাম হোসেন এবং আত্মীয় শাহাদাৎ লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হয়।দুপুরে জানতে পারি তারা সবাই মারা গেছেন।

স্বামীর জন্য বিকেল চারটার দিকে ঘাটে এসে অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, তার স্বামী মিন্টু মিয়া একজন ফল বিক্রেতা। সকালে লঞ্চটিতে করে ঢাকায় যাওয়ার কথা। তার স্বামী কোথায় আছেন,কিভাবে আছেন জানেন না তিনি।

লঞ্চের ফিটনেস, যাত্রী ও ধারণ ক্ষমতার বিষয়ে মিরকাদিম বন্দর কর্মকর্তা ও বিআইডব্লিউটিএর সহকারী পরিচালক মো. বশির আলী খান বলেন, লঞ্চটির ধারণ ক্ষমতা ১২৫ জনের। সেখানে ৭৫-৮০ জন যাত্রী ছিলেন। তারা সবাই মুন্সিগঞ্জের। লঞ্চটির ফিটনেসও ঠিক আছে।

মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক মনিরুজ্জামান তালুকদার  বলেন, কতজন যাত্রী মারা গেছেন, কতজন জীবিত ফিরেছেন এমন সঠিক  তথ্য তার কাছে নেই। তবে যারা মারা গেছেন তাদের পরিবারকে সরকারিভাবে যতটুকু সহযোগিতা করা যায় সেটা করা হবে। লঞ্চে ধারণ ক্ষমতার বেশি যাত্রী নেওয়া হলে এবং ফিটনেস ঠিক না থাকলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড