• বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

হাজারো স্বপ্ন ভাঙ্গার নাম ঘূর্ণিঝড় “আম্পান”

  আকাশ ইসলাম

০৫ জুন ২০২০, ২০:৫৬
সুন্দরবন
আম্ফানে জনজীবন বিপন্ন

তারিখ ২১ শে মে ২০২০। এইতো কয়েকদিন আগের কথা। বঙ্গোপসাগর হতে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় “আম্পান” আঘাত হানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। তার সেই ছোবল থেকে পার পায়নি বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন উপজেলাও। এভাবেই প্রতিবছরই কোন না কোন ঝড় বন্যায়  উপকূলের কোন না কোন জনপদের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পানি আসে, তুফান আসে, আসে প্রলয়ঙ্করী ঝড়-জলোচ্ছ্বাস। উপকূলের মানুষ মরে। ফসলহানী ঘটে। তারই সাথে সাথে নিয়ে যায় হাজারো মানুষের বুক ভরা স্বপ্ন। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, বুলবুল ও আম্পানের আঘাতে বিপর্যস্ত উপকূলের জনপদের এক একটি নাম রামপাল, মোংলা, শরনখোলা, মোড়লগঞ্জ, কচুয়া। তবে সুন্দরবনের কারণে টিকে আছে এখনও এ অঞ্চলগুলো।

ঘূর্ণিঝড় “আম্পান” এ ব্যাপক ভাবে ক্ষতি হয়েছে সুন্দরবনের। ক্ষতি হয়েছে বনের গাছপালা সহ বন বিভাগের স্থাপনা। বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, “আম্পান” এ গোটা সুন্দরবনে ১২ হাজারেরও বেশী গাছপালার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গরান, কেওড়া, গেউয়া, বাইন, সুন্দরীগাছ সহ আর অনেক গাছ। এছাড়াও বনের অভ্যন্তরীণ অফিস, আবাসস্থল, পল্টন, জেটি ও বনবিভাগের ব্যবহিত ১০ টি জলযান এর ক্ষতি হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি টাকার বেশী।

বাগেরহাটের বিভিন্ন উপজেলায় ভেসে গেছে চার হাজার ৬৩৫টি মৎস্য ঘের। এ জেলার রামপাল, মোংলা, বাগেরহাট সদর, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা ও কচুয়ার সবথেকে বেশি মৎস্য ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চাষিদের স্বপ্ন ও ভরসা ভেসে গেছে বানের জোয়ারে। সরকারি হিসেবে এতে প্রায় দুই কোটি ৯০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে চাষিদের। তবে বেসরকারি হিসেবে ঘের ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি।

বাগেরহাট সদর উপজেলার মাঝিডাঙ্গা গ্রামের নারী মৎস্য চাষি হালিমা বেগম বলেন, রাতের ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে আমার ঘেরের মাছ বের হয়ে গেছে। সকালে ঘেরে গিয়ে নেট দিয়েছি। কিন্তু মাছ যা বের হওয়ার রাতেই বের হয়ে গেছে। রামপাল উপজেলার নান্টু মল্লিক  বলেন, ঘেরে বিক্রয় যোগ্য অনেক মাছ ছিল এবং নতুন করেও কিছু পোনা ছেড়েছিলাম। সব মাছ বের হয়ে গেছে। করোনায় দুই মাস ধরে আয় বন্ধ। বিক্রয় যোগ্য মাছের দাম কম থাকায় বিক্রিও করতে পারিনি। এরমধ্যে আবার আম্পানে ভাসিয়ে নিয়ে গেল সব মাছ। শুধু আমার নয় এই উপজেলার অনেকেরই ঘেরের মাছ এভাবে বের হয়ে গেছে।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. খালেদ কনক বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের জোয়ারের জলোচ্ছ্বাস ও অতি বর্ষণে উপকূলীয় বাগেরহাটের ৪ হাজার ৬৩৫টি মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। এতে চাষিদের ২ কোটি ৯০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। 
এছাড়াও বাগেরহাটে ৪ হাজার ৬৮৬টি কাঁচাঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।  নষ্ট হয়েছে মাঠে থাকা সবজি, আমনের বীজতলা, পাকা ধানসহ ১৭শ’ হেক্টর জমির ফসল । এতে কৃষকদের সাড়ে ৬ কোটি ৪০ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিধ্বস্ত ঘরগুলোর মধ্যে চার হাজার ৩৩৯টি ঘর আংশিক এবং ৩৪৭টি ঘর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

জেলার সদর উপজেলা, মোরেলগঞ্জ ও মোংলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। বগী-গাবতলি এলাকার অনেক পরিবার এখনও পানি বন্দি রয়েছে। এর বাইরে বাগেরহাট সদরের ভৈরব ও দড়াটানা নদীর তীরের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৫টি স্থানে নদী সংলগ্ন সড়ক ভেঙে জোয়ারের পানি ঢুকছে। এতে জোয়ারের সময় পানি বন্দি হয়ে পড়ছে কয়েক হাজার মানুষ।

তবে এখনো আম্ফানে ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পূর্ণিমার প্রভাবে  বলেশ্বর নদের জোয়ারের পানি হু হু করে ঢুকে প্লাবিত হচ্ছে গ্রাম। দিনে দুইবার ডুবছে বগী-গাবতলির তিন শতাধিক পরিবার। বসত ঘরের মধ্যে হাঁটু পানি। রান্না-বান্না বন্ধ। দুর্ভোগের আর শেষ নেই ওই পরিবারগুলোর।

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের পর ২৭মে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্ণেল (অব.) জাহিদ ফারুক বাগেরহাটের শরণখোলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি বগী-গাবতলির দুই কিলোমিটার ভেঙে যাওয়া বাঁধ সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে দ্রুত মেরামতের আশ্বাস দেন। 

এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মন্ত্রী এসে বাঁধের আশ্বাস দিয়ে গেছেন। কিন্তু কাজের কোনো খবর নেই। এখন পানিতে ডুবে মরতে হচ্ছে আমাদের। এভাবে কোনো মানুষ বসবাস করতে পারে?

শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরদার মোস্তফা শাহিন  জানান, বগী-গাবতলির ওই দুই কিলোমিটার এলাকা সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে রিংবেড়িবাঁধ দেওয়ার কথা। ইতিমধ্যে তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রাথমিক জরিপ করেছেন। শিগগিরই কাজ শুরু হতে পারে।

তবে ইতিমধ্যে বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জ, শরনখোলা উপজেলায় ৪৫ টি ঘর বিতরণ করেছেন সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর দেওয়া ঘর পেয়ে খুশি আম্পানে ক্ষতিগ্রস্তরা।

এদিকে মোংলা সহ আশে পাশের বেশ কিছু উপজেলায় ঘর বিতরণের কোন খবর পাওয়া যায়নি।তবে উপজেলা পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর বিতরণের জন্য আবেদন সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানা যায়।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মাদ আল মাসুম শরনখোলার ক্ষতিগ্রস্ত বাধ পরিদর্শন করেন এবং জানান, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে অতি দ্রুত বাধ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ করা হবে।

এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করেছেন কোস্টর্গাড, নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনী। জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যদ্রব্য ও বাসস্থানের জন্য টিন, সাবান, স্যানিটাইজার, ঘর বিতরণ, বিশুদ্ধ পানি, স্যালাইন ও নগদ টাকা পৌঁছে দিয়েছে তারা।

এদিকে মোংলায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবের পর শুরু হয়েছে নদী ভাঙ্গন। নদী গর্ভে বসতভিটা দোকানপাট সহ বেড়িবাঁধের ১৮ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নদীর পশে বসবাসকারী ২০ হাজার মানুষ । এলাকায় দেখা গেছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। ভাঙ্গন ঝুঁকিতে কয়েকশত পরিবার। 

ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলবাসীরা বলেন, ঘরবাড়ি সব নদীতে চলে গেছে। থাকার মত জায়গা নাই। খোলা আকাশের নিচে ঝড়বৃষ্টিতে থাকতে হচ্ছে। তার উপর বিশুদ্ধ পানির সংকট। 

এবিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, তালিকা করে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর নির্মাণ সহ ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশবিদ ও সাংবাদিক নুর আলম শেখ বলেন, বাংলাদেশের ফুসফুস সুন্দরবন। যেকোনো মূল্যে এ সুন্দরবনকে আমাদের রক্ষা করতে হবে।শুধু সুন্দরবন নয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আমাদের বাঁচতে হলে পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হতে হবে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড