• বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আর সাক্ষাৎ হলো না ভাষা সৈনিক লাইলীর

  এম এ রহমান, ঝালকাঠি

১১ মার্চ ২০২০, ১৫:৪৩
ভাষা সৈনিক
ভাষা সৈনিক লাইলী বেগম (ছবি : দৈনিক অধিকার)

না ফেরার দেশে চলে গেলেন ঝালকাঠির ভাষা সৈনিক লাইলী বেগম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের শেষ ইচ্ছা পূরণ হলো না তাঁর। দীর্ঘদিন যাবত বার্ধক্যজনিত কারণে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা সিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাত ৯টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি ২ ছেলে ও ৮ মেয়েসহ অসংখ্য নাতি-নাতনি রেখে গেছেন। 

বুধবার (১১ মার্চ) সকালে তার মরদেহ পূর্বচাঁদকাঠি বাসভবনে নিয়ে আসলে সেখানে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। 

লাইলী বেগম জীবদ্দশায় এক সাক্ষাৎকারে জানান, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নেমে বুকের তাজা রক্ত দিয়েছিল। ওই সময় শহীদ হয়েছিল রফিক, শফিক, সালাম ও বরকতসহ আরও অনেকে। সেই খবরটি ঝালকাঠিতে এসে পৌঁছে ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে। তখন ঝালকাঠির স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও ৫২-এর ভাষা আন্দোলনে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল তাদের মধ্যে তৎকালীন সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী লাইলী বেগম (৭৭) এর ভূমিকা ছিল অগ্রগামী। 

লাইলী বেগম জানিয়েছিলেন, ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে স্বাধীনতার বীজ বপন করেছি। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশও স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু ভাসা সৈনিকদের কোনো স্বীকৃতি বা সম্মাননা মেলেনি। বয়স অনেক হয়েছে চলাচল করতেও অনেক কষ্ট হয়। যে কোনো সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি। তবে মৃত্যুর আগে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কথা বলার শেষ ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন তিনি। 

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি জানান, পাকিস্তানিদের চক্রান্তে মামলার স্বীকার হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালে ঝালকাঠিতে এসেছিলেন। তিনি ডাক বাংলোতে অবস্থানকালে আমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাই। দেখা হলে কিছুক্ষণ কথা বলার পরে পানির পিপাসার কথা বলেন। তখন টিউবওয়েল থেকে জগ ভরে পানি এনে তাকে পান করাই। এজন্য সেই সময়ে তিনি আমাকে ধন্যবাদও দিয়েছিলেন। তিনি যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে আমাদের ভাষা সৈনিকদের জন্য একটা সম্মানের ব্যবস্থা করে দিতেন। আমিও তার কাছে গিয়ে ঝালকাঠির লাইলী বলে পরিচয় দিলে তিনি আমাকে চিনতেন আমিও তার সঙ্গে কথা বলতে পারতাম। এখন আমাকে কেউ চিনে না। তাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আশা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। 

একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি স্মৃতিচারণ করে জানান, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় ঝালকাঠিতে কোনো কলেজ ছিল না, স্কুল পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীরাই সেদিন বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দানের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। 

শাসক চক্রের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ১৭ ফেব্রুয়ারি স্কুল ছাত্রদের নিয়ে ৯ সদস্যের সংগ্রাম পরিষদ গঠিত করা হয়েছিল। কমিটিতে জহুরুল আমীন সভাপতি, আমীর হোসেন সহসভাপতি, মোহাম্মদ আলী খান সম্পাদক এবং সদস্য হিসেবে ছিলেন আমিন হোসেন, মোজাম্মেল হক, মরতুজ আলী খানসহ আরও তিনজন। তবে তাদের নাম মনে করতে পারছিলেন না তিনি। সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে এখানকার স্কুল গুলোতে ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল পালনের চেষ্টা করা হলেও গ্রেপ্তারের ভয় দেখানোর ফলে তা সফল হয়নি। এদিন ঢাকায় গুলি বর্ষণের খবর পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে এখানে ছড়িয়ে পড়া মাত্রই উত্তেজিত ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পড়ে। 

স্থানীয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে প্রথম বারের মতো মিছিল বের হয়। মিছিলটি হরচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের কাছে পৌঁছালে ছাত্রদের কাছ থেকে ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর পাই। তখন আমি (লাইলী) সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী থাকাকালে নেতৃত্ব দিলে ছাত্রীরা বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেয়। 

মিছিলটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কাছে পৌঁছালে সেখানকার শিক্ষার্থীরাও এতে যোগ দেয়। মিছিলের সম্মুখভাগে ছিলেন জনসাধারণের পক্ষে একমাত্র  প্রতিনিধি সংবাদপত্রের এজেন্ট আবদুর রশীদ ফকির। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ এবং মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দানের স্বপক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে শহর প্রদক্ষিণ শেষে সরকারি বালিকা বিদ্যালয় মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। 

২৩ ফেব্রুয়ারি আমাকে বাসা থেকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা ধরে নিয়ে যায়। ঝালকাঠি পৌরসভা সংলগ্ন ডাক বাংলোতে নিয়ে কর্মকর্তাদের সামনে হাজির করে আমাকে প্রশ্নে জর্জরিত করেন। কে কে মিছিলে ছিল? তাঁদের বাসা কোথায়? আমি সব জানা সত্বেও কারোরই পরিচয় না দিয়ে আমি বলছিলাম কাউকেই আমি চিনি না। 

এ সময় পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আমাকে লোভ দেখিয়ে বলেন, যদি স্বীকার কর তাহলে অনেক টাকা দেওয়া হবে। আর যদি স্বীকার না কর তাহলে ভয় দেখিয়ে বলেন গুলি করে সুগন্ধা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। আমি তখন দেশ মাতৃকার টানে কারো কোনো পরিচয় দেই নাই। এভাবে তারা দিনের পর দিন আমাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে স্বীকারোক্তির জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। আমার একই কথা ছিল কাউকেই আমি চিনি না। 

এরপর আমার বিয়ে হয় পুলিশের এক হাবিলদারের সঙ্গে। যিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অতন্দ্রভাবে সরকারি ডিউটি এবং বাকিটা সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ব্যয় করতেন। ওই সময় দেশের ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে পুলিশের পরিকল্পনা জেনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে জানাতেন। তাদের ঔরসে ৮ মেয়ে ২ ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। ইতঃমধ্যে এক পুলিশ কর্তার অনৈতিক দাবি উপেক্ষা করে প্রতিবাদ করায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। সন্তানদের মধ্যে কারো কোন ভালো চাকরী না থাকায় কোনমতে জীবনের বাকি সময়টা অতিবাহিত করছেন। তার মনের কষ্ট এখন একটাই দীর্ঘ ৬৬ বছরেও কেউ তাঁদের খোজ নেয়নি, পাননি কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও। 

এমন সাক্ষাৎকারটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ২০১৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন জেলা প্রশাসক হামিদুল হক তাকে ভাষা সৈনিক হিসেবে মর্যাদা দিয়ে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ প্রদান করেন।  

ওডি/এএসএল

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড