• শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২০, ১৪ চৈত্র ১৪২৬  |   ৩৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

সুন্দরবন উপকূলের হাজারো নারীর স্বপ্নের কারিগর চন্দ্রিকা

  মো. মুশফিকুর রহমান রিজভি, সাতক্ষীরা

১০ মার্চ ২০২০, ১১:৪০
সাতক্ষীরা
চন্দ্রিকা (ছবি : দৈনিক অধিকার)

শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী অষ্টমী মালো। ঠিক মতো হাঁটতে পারতেন না। বাড়ি থেকে নিয়ে তার থেরাপির ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করাসহ সময়ে-অসময়ে পাশে থেকে সাহস দিয়ে তাকে জীবনযুদ্ধে জিততে শিখিয়েছেন। তিনি হলেন সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের চন্দ্রিকা ব্যানার্জী। তিনি অনিমেষ ব্যানার্জী ও দীপালি ব্যানার্জী দম্পতির মেয়ে।

চন্দ্রিকা ব্যানার্জী ১৯৬৯ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করলেও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে চলে আসেন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরায়।

একটু ডানপিটে স্বভাবের চন্দ্রিকা ব্যানার্জী ছোটবেলা থেকেই চাইতেন অবহেলিত নারীদের জন্য কিছু করতে। তাই নিজের উপলব্ধি আর মায়ের অনুপ্রেরণায় সুন্দরবন ঘেঁষে গড়ে ওঠা উপকূলীয় জনপদ সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার অবহেলিত দরিদ্র নারীদের দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে মাত্র ৭ জন মহিলাকে নিয়ে নিজ বাড়ির বারান্দায় তিনি শুরু করেন কাঁথা সেলাইয়ের কাজ। আর সেখান থেকে একে একে অনেক নারীদের নিজের সাথে সম্পৃক্ত করে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। গ্রামীণ নারীদের শত সুখ, দুঃখ, কষ্টের কাহিনি প্রতিটি নকশীকাঁথার মধ্যে গাঁথা থাকে তাই তিনি তার সংগঠনের নাম দেন নকশীকাঁথা।

অনেক বিপত্তি পেরিয়ে তিনি আজ স্বনামখ্যাত। তার সংগঠনের আওতায় ৩০টির অধিক প্রকল্পে কাজ করে আত্মনির্ভরশীল হয়েছেন অন্তত হাজারো নারী। তার এসব প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম হলো- সুন্দরবন সংলগ্ন লোনা এলাকায় মিষ্টি পানির পুকুর খনন ও পাড়ে সবজি চাষ, গরু, ছাগল, ভেড়া, হাস ও মুরগির ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে ফার্ম নির্মাণে সহায়তা করা এবং এগুলোর মল দিয়ে বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরি ও মাছ চাষ।

তার সংগঠন ‘নকশীকাঁথা’ থেকে মিষ্টি পানি সংরক্ষণের জন্য ৬০টি ট্যাংক নির্মাণ, দর্জি প্রশিক্ষণ দিয়ে সাড়ে তিনশ নারীকে স্বাবলম্বীকরণ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছে অন্তত কয়েক হাজার নারী-পুরুষ। নকশিকাঁথাসহ বিভিন্ন হস্তশিল্প, সবুজ বনায়ন, কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষাদান, গ্রামীণ স্যানিটেশন নির্মাণ, সুদমুক্ত ঋণ প্রদান, জৈব ও ভার্মী কম্পোষ্ট সার তৈরিসহ অন্তত ৩০টির অধিক প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি এলাকার নারীদের স্বাবলম্বী করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তার এ চেষ্টা অনেকটাই সফল মনে করেন সাতক্ষীরাবাসী। হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক নারী এখন স্বাবলম্বী। সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন তারা। ছাগল ভেড়া ও মুরগি পালন করে অনেকেই স্বাবলম্বী।

তার সংগঠন থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন প্রতিবন্ধী পার্বতী রানী। বিধবা নারী পূর্ণিমা রানী পাল সেলাই মেশিনের কাজ শিখে অন্য নারীদের শেখাচ্ছেন। তিনি বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসার চালানো আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। মানুষের করুণা নিয়ে বাঁচতে চাইতাম না তাই নকশীকাঁথা থেকে সেলাইয়ের কাজ শিখি। সেলাইয়ের কাজ করে এখন আমি স্বাবলম্বী।

তিনি আরও বলেন, আমি কাজ করার পাশাপাশি এখন আরও অনেককে সেলাইয়ের কাজ শেখাই যাতে তারও স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে।

১৯৯৩ সালে মাত্র ৭ জন নারী নিয়ে বাড়ির বারান্দায় যাত্রা শুরু করা ‘নকশীকাঁথা’ আজ মহিরুহে পরিণত হয়েছে। ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও যে কাঁধেকাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারে তার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ‘নকশীকাঁথা’ আরও অনেক নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর কেন্দ্রবিন্দু হবে বলে মনে করেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রিকা ব্যানার্জী। তিনি বলেন, নকশীকাঁথা গড়ে তোলার পেছনে আমার মায়ের অনুপ্রেরণা সব সময় কাজ করেছে। আমি নিজের জীবন থেকে উপলব্ধি করেছি অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে নারীর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তাই অবহেলিত নারীদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছি।

আরও পড়ুন : সিরাজগঞ্জে বাসচাপায় প্রাণ গেল ২ মোটরসাইকেল আরোহীর

তিনি আরও বলেন, শ্যামনগরে অনেক পণ্য উৎপাদিত হয় কিন্তু এই উৎপাদিত পণ্যের নির্দিষ্ট কোনো বিক্রয় কেন্দ্র নেই। আমি শ্যামনগরে উৎপাদিত পণ্যের একটি বিক্রয় কেন্দ্র করতে চাই। আর ‘শেষ ঠিকানা’ নামে নারীদের জন্য একটি বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করতে চাই।

ওডি/জেএস

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড