• মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০, ৩০ আষাঢ় ১৪২৭  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

‘কচি হাতে’ মাথায় উঠে কাঁচা ইট

  ফরিদ আহম্মেদ বাধন, নারায়ণগঞ্জ

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:২৯
নারায়ণগঞ্জ
ইটভাটা (ছবি : দৈনিক অধিকার)

কাক ডাকা ভোরে ওদের ঘুম ভাঙে ইটভাটার মেশিন চালানোর শব্দে। বাবা-মা কাজের জন্য ভাটাতে চলে যাওয়ার পর ওদের দিন কাটে খেলাধুলা আর ইটভাটার ধুলাবালিতে। ওদের দিন কাটে কখনো অনাহার আবার কখনো অর্ধাহারে। বছরের ৬ মাস ইটভাটাতে, বাকি ৬ মাস গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করে। ফলে স্কুলে ভর্তি হয়ে শিক্ষা অর্জন করা হয়ে উঠে না। এমন চিত্র নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশের ইটভাটাগুলোতে অবস্থান করা কয়েক লাখ শিশুর। পিতা মাতার প্রবল আগ্রহ থাকার পরও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা। ভাটাগুলোতে কাজ করা শ্রমিকদের সন্তানরা এভাবেই অক্ষর জ্ঞানহীন থেকে যাচ্ছে। যে বয়সে কাঁধে স্কুল ব্যাগ থাকার কথা, ঠিক সেই বয়সে কচি হাতে নিজের মাথায় উঠিয়ে নেয় কাঁচা ইট। আর এই চিত্রগুলো বাংলার প্রতিটি ইটভাটায়। 

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালে সারা দেশে ৪ হাজার ৯৫৯টি ইটভাটা ছিল। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯০২টি। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের জেলাগুলোতে ১ হাজার ৩০২টি ইটভাটা ছিল। সম্প্রতি অল্প কিছু ইটভাটা পরিবেশ দূষণের দায়ে বন্ধ হলেও এখনো চলছে ৫ শতাধিক ভাটা। ভাটায় কাঁচা ইট উৎপাদনের জন্য প্রতিটি পাক মেইলে (মাটি গুলানোর মেশিন) মোট ১৬ জন পুরুষ ও মহিলা কাজ করে। ভাটাতে ৩টি, আবার কখনো ৪টি মেইল (মাটি গোলানোর কাজে ব্যবহৃত মেশিন) থাকে। একেকটি মেইলে কাঁচা ইট রোদে শুকানো পর্যন্ত মোট ১৬ জন ব্যক্তির প্রয়োজন হয়। এরপরে কাঁচা ইটকে ক্লিনে (পোড়ানোর স্থান) নেওয়ার জন্য কয়েকটি ধাপে শতাধিক ব্যক্তির প্রয়োজন হয়। নারায়ণগঞ্জ ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে গড়ে প্রতিটি ভাটায় ৭০ জন শ্রমিক কাজ করে থাকে। বন্ধ হওয়ার পর ৮শ ইটভাটায় কাজ করছে ৫৬ হাজার শ্রমিক। এর মধ্যে অতিরিক্ত ২০ হাজার শিশু ইটভাটাতে কোনো না কোনো কাজে জড়িত রয়েছে বলে জানা গেছে।

যে বয়সে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার কথা, ঠিক সেই বয়সে তারা তাদের কচি হাতে মাথায় কাঁচা ইট তুলে নেয়। বাবা-মায়ের সঙ্গে শিশুরাও কাজ করে জীবন জীবিকার তাগিদে। ভাটাগুলোতে ৫ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুরা কাঁচা ইট উল্টানো, এরপর শুকনো ইটকে মাথায় করে পোড়ানোর স্থানে (চুল্লিতে) নিয়ে যাওয়ার কাজও করে থাকে। শিশুরা সারা দিনে একেক জন ৫০ থেকে ৬০ টাকা আয় করে। অপরদিকে ২ থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুরা ঝুঁকি নিয়ে কয়লা ভাঙানোর মেশিন, চুল্লির সামনেও অবস্থান করে। ধুলো মাটিতে মিশে একাকার হয়ে উঠে ওদের শৈশব। ইটভাটাই যেন ওদের খেলার মাঠ। এভাবেই দেখতে দেখতে তারা বড় হয়ে ভাটার শ্রমিক হয়ে উঠে। শিক্ষার আলো থেকে তারা বঞ্চিত থেকে যায়। কালের গর্ভে হারিয়ে যায় ওদের ইতিহাস।

এ ব্যাপারে বক্তাবলী এলাকার একটি ইটভাটার কনট্রাক্টর হালিম বলেন, ‘গরিব অইয়া জন্মাইছি। খাইয়া বাঁচতে অইবো, এইডাই আমরা ছুডু বেলা অইতে জানছি। শিক্ষা দিয়া আমরার কী অইবো। লেহা পড়া কইরা আমাগোতো আর চাকরি বাকরি অইবো না।’

এ ব্যাপারে বক্তাবলী ও এনায়েতনগর ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি এবং বক্তাবলী ইউপি চেয়ারম্যান এম শওকত আলী বলেন, ইটভাটাতে যে সমস্ত শ্রমিক কাজ করে তারা ভাটা মৌসুমে কাজ করার জন্য ভাটায় চলে আসে। আসার সময় সঙ্গে করে তাদের শিশু সন্তানদের নিয়ে আসে। শিশুরা সকাল থেকেই ইটভাটায় বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়ায়। আগামী বছর থেকে মালিকদের পক্ষ থেকে শিশুদের ইটভাটাতে লেখাপড়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শিশু শ্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে ভাটা মালিকরা যাতে সতর্ক থাকে সেদিকে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড