• রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

৭ প্রতিবন্ধীকে নিয়ে চলছে সরলা দেবীর কষ্টের জীবন

  যশোর প্রতিনিধি

০৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:৩২
প্রতিবন্ধী
পরিবারের প্রতিবন্ধী সদস্যরা ( ছবি : দৈনিক অধিকার )

যশোরের চৌগাছায় এক পরিবারে ৭ প্রতিবন্ধীকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের (ঋষি) নারী সরলা দেবী। তার অভিযোগ সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের ভুলেই তার সন্তানদের আজ এই অবস্থা। চিকিৎসকদের ভুলের মাশুল তাকে এখন প্রতিবন্ধী সন্তানের বোঝা বইতে হচ্ছে। 

স্থানীয়রা জানায়, চৌগাছা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ঋষিপাড়ার বাসিন্দা নিরঞ্জনের স্ত্রী সরলা বালা। ঋষিপাড়া হলেও এলাকাটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। শহরের মেইন বাসস্ট্যান্ড থেকে ২০০ মিটার দূরত্বে পাকা সড়কের পাশেই সামান্য জমির ওপর কাঁচা-পাকা ঝুপড়ি টাইপের বাড়ি সরলার। হত দরিদ্র সরলার জীবন চলে বোকার (পাঠা) মাধ্যমে বকরি (ছাগল) পাল (প্রজনন) দিয়ে। 

একসময় বেশ কয়েকটি পাঠা থাকলেও এখন মাত্র দুটি পাঠা আছে তার। স্বামী নিরঞ্জন করিমন (স্থানীয় ইঞ্জিন চালিত বাহন) চালাতেন। স্ট্রোকের পর প্যারালাইজড হয়ে বছর তিনেক হলো কোনোভাবে চলতে-ফিরতে পারেন। সরলার চার ছেলের মধ্যে ছোট ৩ ছেলে মহন (১৯) এবং জমজ মিলন ও নয়ন (১৫) লাইগেশনের পর জন্ম নেয়। তারা তিনজনই শারীরিক এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। পাঁচ মেয়ের মধ্যে বড় অম্বালিকা (৩৫) শিশুবেলায় হামজ্বরে আক্রান্ত হয়ে এখন দৃষ্টিশক্তিহীন। সেজো মেয়ের ২ ছেলে বিদ্যুৎ (১৪) ও বিধান (১২) বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাদেরও নেই থাকার কোনো জায়গা। তারা সরলার বাড়িতেই থাকে। উপজেলা সমাজসেবা অফিস এসব প্রতিবন্ধীদের ভাতার আইডি কার্ড দিয়েই দায়িত্ব সেরেছে। 

সরলার বাড়ি গিয়ে কথা বলতে চাইলে প্রথমে তিনি কথাই বলতে চাচ্ছিলেন না। ক্ষোভের সঙ্গে বলছিলেন ‘বাপু কত লোক আসে। বলে এ দেব, ও দেব। শুনে চলে যায়। কিছুই তো পাইনে। তোমাদের সাথে কথা বলতে আমার যে সময় নষ্ট হবে, সে সময়ে আমার কাজ করতে পারবো। এই দেখ কাল সন্ধ্যা থেকে আমার একটা ছাগল হারিয়ে গেছে। সেই সকাল থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি, পাচ্ছি না।’ এরপর তিনি স্বাভাবিক কথা বলেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। 

তিনি ঘরের বরান্দায় বসতে দেন একটা মাদুর পেতে। বলেন, শুনবা? আমার এই কাহিনী? ‘তুমরা বাপু শিক্ষিত মানুষ। আমরা তো হত-দরিদ্র। আমার এইটুকুই আছে বলে চলেন সরলা। বিয়ের পর আমার পরিবার-পরিকল্পনার বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না। তোমাদের কাকাও (নিরঞ্জন) এসব নিয়ে ভাবতেন না। আমার একটি সন্তান শিশু বেলায় মারা যায়। এরপর চৌগাছা সরকারি হাসপাতালের লোকেরা আমার বাড়িতে আসে। সে সময় হাসপাতালের টিএইচও ছিলেন ডা. অরুন কুমার বিশ্বাস। তাদের আশ্বাসে ১৯৯৮ সালের শেষ দিকে অথবা ১৯৯৯ সালের শুরুর দিকে চৌগাছা হাসপাতালে আমার পেট কেটে লাইগেশন (অপারেশন) করা হয়। কিন্তু তারপরও ১৯৯৯ সালে আমার পেটে সন্তান আসে।’

‘আমি হাসপাতালে গেলে তারা বলেন সন্তান আসেনি। তোমার পেটে কিছু হয়েছে। ২০০০ সালের ৫ জুন আমার ছেলে মহনের (বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী) জন্ম হয়। এরপর আমি আবারও হাসপাতালে গেলে আমাকে আবারও অপারেশন (দিন তারিখ মনে করতে পারছিলেন না) করা হয়। এরপর আমি আবারও গর্ভবতী হয়ে পড়ি। এবার আমার জমজ সন্তান পেটে আসে। সন্তান পেটে আসলে আমি আবারও হাসপাতালে যাই। তখনও ডাক্তারা বলে তোমার পেটে কোনো সন্তান নেই। আমি বলি জমজ সন্তান আছে। এ নিয়ে ডাক্তারদের সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি হয়। তারা জোর দিয়ে বলে তোমার পেটে সন্তান নেই। আর আমি বলি আছে। জমজ সন্তান আছে। এরপর তারা আমাকে যশোরে পাঠায় পরীক্ষা করতে। সেখানে ডাক্তাররা আমার পেট টিপেটিপে ব্যাথা করে দেয়। তখন আমি রাগ করে বলি আপনারা আমাকে ছেড়ে দেন। আমার পেটে জমজ সন্তান। আর আপনারা শুধু টিপে ব্যাথা করে দিচ্ছেন। পেটের মধ্যে যদি আমার সন্তানরা মারা যায়। আপনারা দায়িত্ব নেবেন?’

‘এরপর আমার কি যেন পরীক্ষা করা হয়। পরে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি আমার জমজ ছেলে মিলন ও নয়নের (বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী) জন্ম হয়। তাদের জন্মের পর আমাকে হাসপাতালে ডেকে নিয়ে কিছু টাকা দেওয়া হয়। বলা হয়, এ নিয়ে তুমি কোনো ঝামেলা করো না। আমি গরীব মানুষ। আমি কি বা করবো তোমরাই বলো? বড় ছেলে মদন তার স্ত্রী নিয়ে আলাদা থাকে। স্বামী করিমন (ইঞ্জিন চালিত) চালিয়ে নিজের সংসার চালায়। বড় মেয়ে অম্বালিকা আমার ঘাড়ে। অন্য মেয়েদের বিয়ে দিছি। তাদের মতো তারা কোনো রকমে কাজ করে চলে। সেজো মেয়ের ২ ছেলে। তারাও বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাদের কোনো জমি নেই। এই দেখ আমার কাছে থাকে। ছোট ছেলে দুটো (মিলন ও নয়ন) ওই দেখ বইয়ের প্যাকেট নিয়ে স্কুলে যায়। পড়া তো পারে না। শুধুই যায়।’

চৌগাছা পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আতিয়ার রহমান জানান, ওই পরিবারের বড় মেয়ে এবং তার বাবাকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড কম হওয়ায় তাদের সবাইকে ভাতা দেওয়া যায়নি। শতভাগ প্রতিবন্ধীদের ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা হলেই কেবল সবাইকে ভাতার আওতায় আনা হতো।

চৌগাছা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নির্মল কান্তি কর্মকার জানান, বর্তমানে কোনো পরিবারে শতভাগ প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। ২০১৬ সালে একটি এনজিওর মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর একটি প্রতিশ্রুতি আছে দেশের শতভাগ প্রতিবন্ধীদের ভাতার আওতায় আনা হবে। সেটি হলেই কেবল ওই পরিবারের সবাইকে ভাতা দেওয়া সম্ভব হবে।

ওডি/এসএএফ 

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড