• রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

চোর সন্দেহে কারাবন্দি কিশোর, দেওয়া হয়নি পিইসি পরীক্ষাও

  শাহ মুহাম্মদ রুবেল, কক্সবাজার

০১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:৩৪
কারাবন্দি
চোর সন্দেহে আড়াই মাস ধরে কারাবান্দি স্কুলছাত্র শাহ আমিন (ছবি : দৈনিক অধিকার)

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রেজুরকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র শাহ আমিন। দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে সে কারাবন্দি রয়েছে গাজীপুর শিশু কারাগারে। ফলে দেওয়া হয়নি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া পিইসি পরীক্ষাও। এতে তার ভবিষ্যৎ জীবনে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার।

জানা গেছে, নিরীহ ও মেধাবী এই ছাত্রকে সম্পূর্ণ সন্দেহভাজনভাবে ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই সিদ্ধার্থ সাহা শারীরিক নির্যাতনের পর প্রতিবেশীর ঘরে চুরির মামলায় জড়িয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন।

এ দিকে, অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায়, মামলা পরিচালনা করে তাকে জামিনে মুক্ত করার চেষ্টাসহ গাজীপুর শিশু কারাগারে গিয়ে তার সঙ্গে প্রায়সই সাক্ষাৎ করতে করতে অনেকটা নিঃস্ব হয়ে পড়েছে শাহ আমিনের পরিবার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকার গাজীপুরস্থ টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে বন্দি রয়েছে শাহ আমিন। সে উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের রেজুরকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির নিয়মিত ছাত্র ও সদ্য শেষ হওয়া প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) পরীক্ষার্থী। তার বাবা শামশুল আলম জালিয়াপালং ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পাইন্যাশিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও পেশায় একজন দিনমজুর।

গত ২৬ আগস্ট রাতে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নূরুল আমিন চৌধুরীর ভাই ও পাইন্যাশিয়া গ্রামের মৃত আমিনুল হক চৌধুরীর বসতঘরে চুরির ঘটনা ঘটে। এ সময় নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও দামি কয়েকটি মুঠোফোনসহ প্রায় আড়াই লাখ টাকার মালামাল চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এই চুরির ঘটনায় কারা জড়িত সেটা নিশ্চিত হতে না পারায় দীর্ঘদিন মৃত আমিনুল হক চৌধুরীর পরিবারটি কোনো মামলাও করেননি।

এ দিকে, চুরির দীর্ঘ ২৪ দিন অতিবাহিত হলে ওই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে স্কুলছাত্র শাহ আমিনকে ধরে আনেন উখিয়ার ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই সিদ্ধার্থ সাহা। পরে শারীরিক নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদেও শাহ আমিন চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, তা স্বীকার করাতে ব্যর্থ হন। পরে শাহ আমিনকে উখিয়া থানায় সোপর্দ করা হলে গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে থানায়ও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেখানেও কোনো তথ্য বের করতে ব্যর্থ হয় পুলিশ।

এরপর মৃত আমিনুল হক চৌধুরীর স্ত্রী জাহানারা বেগম বাদী হয়ে উখিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় রেকর্ডপূর্বক স্কুলছাত্র শাহ আমিনকে ২১ বছর বয়সী উল্লেখ করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। পাশাপাশি মামলাটিতে স্কুলছাত্র শাহ আমিনসহ তিনজনকে আসামি করা হয়।

এই সঙ্গে নিয়মিত মামলাটির এজাহারের ও আসামির চালান ফর্দে ১ নম্বর ক্রমিকের আসামি শাহ আমিনের বয়স ২১ বছর উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীকালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সিদ্ধার্থ সাহা শাহ আমিনকে আদালতে সোপর্দ করলে আদালতও স্বাভাবিক বয়সের আসামি হিসেবে তাকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে প্রেরণ করে। কিন্তু কক্সবাজার জেলা কারা কর্তৃপক্ষ স্কুলছাত্র শাহ আমিনের শারীরিক গঠন পর্যালোচনায় অপ্রাপ্ত বয়সের বিবেচনা করে তাকে শিশু কারাবন্দিদের জন্য নির্ধারিত টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে প্রেরণ করেন।

এ দিকে, জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আমিন চৌধুরী প্রদত্ত জন্ম সনদ ও অনলাইন জন্ম নিবন্ধন তথ্য যাছাইসহ রেজুরকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমৃত কুমার বড়ুয়া প্রদত্ত পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থী সনদ এবং ১৭ নভেম্বরের পিইসি পরীক্ষার্থীর প্রত্যয়ন পত্র পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এতে দেখা যায়, শাহ আমিনের জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৫ সালে। সে মতে তার বর্তমান বয়স ১৪ বছর ২ মাস।

এ ব্যাপারে রেজুরকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমৃত কুমার বড়ুয়া জানান, ‘শাহ আমিন স্কুলের নিয়মিত ও মেধাবী ছাত্র। সে চুরির ঘটনায় জড়িত বা চুরি করেছে তা আমি বিশ্বাস করি না। স্কুলে সদা হাস্যোজ্জ্বল, খেলাধুলা ও পড়াশোনায় ব্যস্ত ছাত্রটির মুখচ্ছবি প্রায় ভাবনায় এলে মনটা হাহাকার করে ওঠে। তার শিশু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পিএসসি পরীক্ষাতেও সে অংশ নিতে পারেনি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।’

এ দিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাহ আমিনের এলাকার অনেকেই জানিয়েছেন, ‘স্কুলছাত্র শাহ আমিন চুরির ঘটনায় জড়িত ছিল এটা অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর। এমন বয়সের শিশুর পক্ষে গভীর রাতে অন্যের ঘরে চুরির মতো অসাধ্য কাজ করাও অবিশ্বাস্য।’

তারা বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে অধ্যয়নরত অবুঝ ও সহজ-সরল একটা স্কুলছাত্রকে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা সাক্ষী কিংবা নির্ভরশীল তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই শুধু সন্দেহের বশে নির্মম নির্যাতনসহ মারধর করে মামলায় জাড়িয়ে কারাগারে প্রেরণ করা খুবই অমানবিক।

এ দিকে, বসতঘরে চুরির ঘটনার দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় পার হতে চলেছে। কিন্তু চুরি হওয়া পরিবারের কোনো সদস্য বা প্রতিবেশীদের কেউ, এমনকি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাও এই ঘটনায় কারা জড়িত তা নিশ্চিত হতে পারেননি। মিলেনি নিরীহ স্কুলছাত্র শাহ আমিন চুরিতে জড়িত থাকার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণও। এমনকি এখন পর্যন্ত চুরির ঘটনায় উদ্ধার হয়নি কোনো আলামতও। 

অন্যদিকে, স্কুলছাত্র শাহ আমিনকে আটক করে কারাগারে প্রেরণের দীর্ঘ আড়াই মাস অতিবাহিত হলেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সিদ্ধার্থ সাহা নাকি জানেন না যে, শাহ আমিন স্কুলছাত্র ও তার বয়স ১৪ বছর!

উল্টো তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই (নিরস্ত্র) সিদ্ধার্থ সাহা জানালেন, ‘অন্যান্য যে কোনো ফৌজদারি মামলাগুলো তদন্তের চেয়ে সিঁধেল চুরির মামলা তদন্ত করা খুবই জটিল এবং সময় সাপেক্ষ। মামলাটি তদন্তাধীন থাকায় কোনো মতামত দেওয়া যাবে না।’ তিনি বলেন, শাহ আমিন যে পিইসি পরীক্ষার্থী বা পঞ্চম শ্রেণির স্কুলছাত্র তা আমার জানা নেই। 

অথচ অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনিই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করে আদালতে সোপর্দ করেছেন।

ওডি/আইএইচএন

আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইল করুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড