• মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

সিনেমায় রেলগাড়ি

  জাহিদুল ইসলাম জুবায়ের, মো. জাহিদ হোসেন ও মাহমুদা ইয়াসমিন কনা

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:৫৯
নায়ক
সত্যজিৎ রায়ের নায়ক চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য (ছবি : সংগৃহীত)

‘‘ঝক ঝকা ঝক ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে ওই,
ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে, ট্রেনের বাড়ি কই’’

ছোটবেলায় এই ছড়াটি আমরা সকলেই কম বেশি গাইতাম। ট্রেন অথবা রেলগাড়ি আমাদের জীবনের প্রতিটি সময় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সময় পেলেই বিকেলে রেললাইনের ওপর হাঁটতাম, কিংবা বসে আড্ডা দিতাম। আবার অনেকেই কখন রেলগাড়ি আসবে, সেই ঝক ঝকা ঝক শব্দ শোনা যাবে সেই অপেক্ষায় থাকতাম। 

বাংলাদেশি, বাঙালি কিংবা অবাঙালি সকলের কাছেই এই রেলগাড়ি একটি পরম আকর্ষণের জিনিস, যাতে মিশে আছে নানান স্মৃতি, আবেগ আর ঐতিহ্য গাঁথা। সময়ের সাথে সাথে এই রেলগাড়ি আর রেল প্রযুক্তিতে এসেছে নানা পরিবর্তন কিন্তু রেলগাড়িকে নিয়ে মানুষের সেই চিরায়ত আকর্ষণের খনিতে আজও ভাটা পড়েনি। বরং দিনকে দিন সেই আকর্ষণ হয়ে উঠেছে বিভিন্ন উৎকর্ষ সাধনের বস্তু। রেলগাড়ি যেমন হয়ে উঠেছে কবির কবিত্বের সঞ্জীবনী তেমনি জগত বিখ্যাত উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু। রেলগাড়িকে কেন্দ্র করে লিখা হয়েছে শত শত গান যেখানে শুরুতেই মনে পড়ে যায়, গীতি কবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের সেই মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বিখ্যাত গান, ‘‘সেই রেল লাইনের ধারে মেঠো পথটার পরে দাঁড়িয়ে, এক মধ্যবয়সী নারী এখনো রয়েছে হাত বাড়িয়ে।’’ 

এই রেললাইনের সাথেই মিশে থাকে এমন হাজার স্মৃতি, কাহিনী, ভালো লাগা, ভালোবাসা। যাকে কেন্দ্র করে বানানো চলচ্চিত্রগুলো আজও দর্শক মহলে সমাদৃত আর এই সমাদরকে পুঞ্জীভূত করেই দেশি বিদেশি নির্মাতারা সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি বছরই নির্মাণ করে যাচ্ছে হাজারো চলচ্চিত্র। 

শুরুতেই বাংলা চলচ্চিত্রের কথায় আসা যাক। ১৯৭৮ সালে আমজাদ হোসেন নির্মিত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ চলচ্চিত্রটি এ যাবত কালে রেলগাড়িকে কেন্দ্র করে যতগুলো বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে তাদের মধ্যে একটি।

পোলার এক্সপ্রেস চলচ্চিত্রের দৃশ্য (ছবি : সংগৃহীত)

এই চলচ্চিত্রটি শুরুই হয়েছে রেললাইনের একটি দৃশ্য দিয়ে যার উপর দিয়ে গোলাপী হেঁটে যাচ্ছে। নিম্নশ্রেণির এক মেয়ে গোলাপীর রেলগাড়িতে গান গাওয়া এবং রেল ভ্রমণের এক করুণ দৃশ্যপট তুলে ধরা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। চিত্র নায়িকা ববিতার বাস্তবধর্মী অভিনয় আসলেই প্রশংসার দাবিদার এবং সকলকেই ‘গোলাপী’ নামক মেয়েটিকে নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে উৎসাহিত করে। 

চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলব আর সত্যজিৎ রায়ের কথা আসবে না তা কিন্তু হয় না। রায়ের অনেক চলচ্চিত্রেই রেলগাড়ি ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তেমনি একটি ভারতীয় বাংলা ড্রামা চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘নায়ক’। উল্লেখ্য যে এই চলচ্চিত্রের কাহিনী ও চিত্রনাট্য সত্যজিৎ নিজেই রচনা করেছিলেন। ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রটি আজও আমাদের মনে দাগ কাটে। অরিন্দম (উত্তম কুমার) নামক এক চিত্রনায়ক আর অদিতি (শর্মিলা ঠাকুর) নামক এক সাংবাদিকের প্রেমময় কথোপকথন এবং রেলগাড়ি ভ্রমণে রোমাঞ্চকর ঘটনা এক অন্যরকম আবেশ তৈরি করে আপনার-আমার মাঝে। এই মৌলিক চলচ্চিত্রের প্রতিটি সংলাপ আর প্রকৃতির সঙ্গে রেল দৃষ্টান্তের যুগলবন্দি আসলেই সত্যজিৎকে নিয়ে গিয়েছে অন্য এক স্তরে। 

বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে হুমায়ুন আহমেদের অবদানও অপরিসীম। তার লেখা উপন্যাস অবলম্বনে যে কয়টি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে সেগুলোর মধ্যে ‘আমার আছে জল’ এবং ‘দারুচিনি দ্বীপ’ দর্শক মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং আজ অবধি সেই আলোড়ন রয়েই গেছে। ‘আমার আছে জল’ চলচ্চিত্রের সেই ‘সোহাগী’ নামক রেলওয়ে স্টেশনের সৌন্দর্য আর ‘অচেনা ইস্টিশন’ নামক গানটি দর্শকদের নিয়ে গিয়েছিল এক অপার সবুজপত্রের দুনিয়ায়।

এক ঝাঁক ভ্রমণ পিপাসু তরুণ তরুণীর সমুদ্র বিলাসের কথাই বলে হুমায়ুনের ‘দারুচিনি দ্বীপ’। হাজারো স্বপ্নের রেলগাড়ি ভ্রমণ আর সমুদ্রের নোনা পানিতে স্নানের স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই রয়ে যায় সেই তরুণ তরুণীদের। তারপরও তারা স্বপ্ন দেখে সেই দারুচিনি দ্বীপে যাবার। চলচ্চিত্রের শেষ মূহুর্তে দেখানো রেলগাড়ির দৃশ্যটি ‘দারুচিনি দ্বীপ’ চলচ্চিত্রকে করেছে সার্বজনীন। 

কমিউটার চলচ্চিত্রের দৃশ্য (ছবি : সংগৃহীত)

ভারতের হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্রগুলোও এদিক দিয়ে পিছিয়ে নেই। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, অ্যাকশন কিংবা সবগুলোরই সংমিশ্রণ যেন এই রেলগাড়িকে করেছে আরও প্রাণবন্ত এক বিষয়। সেই নব্বই দশকের ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ থেকে শুরু করে এই যুগের ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’, সব খানেই রেলগাড়ি যেন এক ভালোবাসা আর আবেগের বস্তুকণা। ‘গুন্ডে’ চলচ্চিত্রটিতেও সব কিছু ছাপিয়ে উঠে এসেছে বন্ধুত্ব আর জীবন যুদ্ধে জয় হওয়ার ঘটনা। 

‘বজরঙ্গী ভাইজান’ চলচ্চিত্রের সেই ছোট্টো শাহীদার কথা কি মনে আছে? এই রেলগাড়িই কিন্তু বোবা শাহীদার জীবনে এনে দিয়েছিল নতুন এক অধ্যায় আর এই কারণেই এই চলচ্চিত্রটিও ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র হিসেবে নিজেকে দাবি করতে পারে।

অনেক তো ভারতীয় চলচ্চিত্র নিয়ে কথা হলো, এবার না হয় হলিউডে রেলগাড়ির সমাদর নিয়ে কিছু বলি। বিশ্ববিখ্যাত অভিনেতা জ্যাকি চ্যান অভিনীত অ্যাডভেঞ্চার চলচ্চিত্র ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’ থেকে শুরু করে হরর অ্যাকশন চলচ্চিত্র ‘আব্রাহাম লিংকন: ভ্যাম্পায়ার হান্টার’, সবখানেই ছিল রেলগাড়ির অবাধ বিচরণ। আর হ্যারি পটার সিরিজের কথা তো বলার দরকারই নেই। সেই জাদুর জগত হগওয়ার্টসের যাত্রা তো এই রেলগাড়ি দিয়েই শুরু। এই রেলগাড়ি আর তাতে করে সেই জাদুর দুনিয়ায় গমন জে কে রাওলিংকে এনে দিয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত হওয়ার সম্মান।

মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন এক্সপ্রেস চলচ্চিত্রের দৃশ্য (ছবি : সংগৃহীত)

চলচ্চিত্র কখনো মানুষের কল্পনা, কখনো বা কঠিন বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ। আর এই প্রকাশ মাধ্যমের বিষয়বস্তু যখন হয় রেলগাড়ি তখন সেটা হয়ে উঠে আমদের ভালো লাগা এবং ভালোবাসার জিনিস। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে এই রেলগাড়িতেও। কিন্তু চলচ্চিত্রে এর কদর কমেনি এক রত্তিও, বরং বেড়েছে হাজার গুণ। এই রেলগাড়িকে নিয়ে আজও জগত বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, আর সেটা হলো দর্শকের মনের মণিকোঠায় বিচরণ করা এবং তাদের অন্য এক চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করানো। রেলগাড়ির প্রতিটি রেলপথে মিশে থাকে এক একটি গল্প, আর তা থেকেই তৈরি হয় এক একটি চিত্রকল্প, নতুন কোনো সৃষ্টি, কোনো কাহিনী।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেসনালস

ওডি/এমএ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড