• মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

একটি সরলরেখা কাগজের ওপর হাঁটাহাঁটি করলেই একটি ছবি হয়ে যায়

  বাপ্পি লিংকন রায়

২৯ জুন ২০১৯, ১১:৪৫
পল ক্লি
জার্মান চিত্রশিল্পী 'পল ক্লি'

“সর্বোপরি, জীবিতশিল্প, তারপরে আসে পেশা, কবিতা ও দর্শন; অতঃপর আমার বাস্তব পেশা হিসাবে, বাস্তবিক শিল্প হিসেবে; শেষ অবলম্বনে, সীমিত আয় ও সেখায়নে।”- পল ক্লি

পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা যে কয়জন ক্ষেপা চিত্রশিল্পীর কথা শুনতে পাই তাদের মধ্যে সুইস বাংশভৃত শিল্পী পল ক্লি একজন। তিনি ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে সুইজারল্যান্ডের সুচেনবুচিসে জন্মগ্রহণ করেন। জার্মান সংগীত শিক্ষক হ্যান্স উইহেল ক্লে ও মা সুইস গায়ক ইডা মেরি ক্লে, নেক্সিকের দ্বিতীয় সন্তান তিনি।

ছোট বেলা থেকেই পল ছিল অতি উৎসাহী ও প্রতিভাবান এক বালক। পিতা মাতার সংগীতপ্রীতি তাকেও সুনাম এনে দিয়েছিল কিন্তু ধরে রাখতে পারেননি। ১৮৯৪ সালে পল তাঁর পিতা-মাতার অনিচ্ছা সত্ত্বেও মিউনিখের ফাইন আর্টস একাডেমিতে হেনরিচ, নাইর এবং ফ্রাঞ্জ ভন স্টকের সাথে শিল্পচর্চা শুরু করেন। এই সময়ে শিল্পী প্রকৃতি ও নিম্নশ্রেণি নারী পুরুষের কাছাকাছি থেকেছেন, সময় কাটিয়েছেন, শিল্প ধ্যান করেছেন। এই সময়ে শিল্পীর কাজে আমরা প্রচুর প্রকৃতি ও মানবকে নিয়ে এক রঙ্গিনে উপস্থাপন দেখি।

 

picture

পল ক্লি'র চিত্রকর্ম 'Cat and Bird' 

ফাইন আর্টসের ডিগ্রি অর্জনের পর, পল তার বন্ধু হর্মেন হ্যালারের সাথে ১৯০১ থেকে ১৯০২ পর্যন্ত ইতালি থাকেন। তিনি সর্বদা সাধনা ও গবেষণার মাধ্যমে শিল্পের নতুন পথ খুঁজেছেন। এচিং হলো ছাপচিত্র মাধ্যমের শিল্প পদ্ধতি। এই মাধ্যমেও তাঁর পারদর্শিতা, নিষ্ঠা ও গভীর আবেদনের প্রকাশ ঘটিয়ে চিত্র সংগীতের ছিত্রময়তার নবীন মাত্রা শুরু করে। এচিং বা খোদাই পদ্ধতিতে তিনি বেশ কিছু কাজ করেন। “পোর্টেট অফ মাই ফাদার” (১৯০৬) এই মাধ্যমের করা অন্যতম কাজ।

১৯১০ সালে বার্নেতে তার প্রথম একক প্রদর্শনী হয়, যা পরবর্তীতে তিনটি সুইস শহরেও প্রদর্শিত হয়। এর মাধ্যমেই পল ক্লি শিল্পরসিক ও শিল্প বোদ্ধাদের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তার একটি বিখ্যাত উক্তি- ‘একটি সরলরেখা কাগজের ওপর হাঁটাহাঁটি করলেই একটি ছবি হয়ে যায়।’

সময় ও বাস্তবতার সঙ্গে তিনি সর্বদা নিজেকে উজাড় করেছেন। শিল্পের বিভিন্ন শৈলী যেমন এক্সপ্রেশনিজম, কিউবিজম এবং সুয়বিলিজম খাতে শিল্পের সঙ্গে আরও হৃদ্যতা বৃদ্ধি করেছে। আর শিল্পজগৎ হয়েছে সমৃদ্ধি। ১৯১২ সালে প্যারিসে তার ভ্রমণের ফলে কিউবিজম চর্চা ও বিমূর্ত শিল্পের প্রতি তার ভাবনার নতুন মাত্রা যোগ হয়। 

 

picture

পল ক্লি'র চিত্রকর্ম 'Senecio' 

ক্রমেই রং ও ফর্ম তাকে শিল্পের নান্দনিকতায় পর্যবসিত করে। ১৯১৪ সালে সুইজারল্যান্ডের বাড়িতে ফেরার পর, তিনি প্রথম সার্থক বিমূর্ত চিত্র “ই দ্যা স্টাইল অব কেয়ারউনের” (১৯১৪) সৃষ্টি করেন। এই সময়ের কাজে রং ও ফর্ম মূর্ছনায় চিত্রগুলো গভীর আবেদন  ও সান্ত্রিতিকতা রূপায়নের ছাপ লক্ষ্য করা যায়।

ভাবুক চিত্রশিল্পী সময়ের দাবিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও যোগ দেন। যুদ্ধ, ধ্বংস ও হতাশা কখনোই তাকে দমাতে পারিনি। তিনি ব্যারাত ব্লকের বাইরে একটি ছোট কক্ষে থাকতেন ও ছবি আঁকা চালিয়ে যেতেন। এই সময়ের অসংখ্য শিল্পকর্মের মধ্যে লক্ষ্যণীয় হলো বিভিন্ন ধরনের রং একত্রে কিংবা একটি অন্যটির সঙ্গে মিলিয়ে আঁকা এবং জ্যামিতিক ফর্মগুলোর অধিক ব্যবহার। 

মোট কথা হাতের কাছে যেটুকু সম্বল ছিল তাই ব্যবহার করেছেন। শিল্প রচনার জন্য কোনো একটি মাধ্যমের ওপর অধিক আস্থা রাখেনি। জলরং, কালি, প্যাস্টেল, মিশ্রমাধ্যম ও ছাপচিত্র মাধ্যমেও তার  অসংখ্য কাজ আমরা পাই। 

শিল্পী পলের চিত্র নিয়ে আলোচনা করলে প্রথমেই আসে প্রকৃতির কথা। তার চিত্রে আমরা দেখি পৃথিবীর ফুল, পাখি, মাছ, গাছ, মানুষ ইত্যাদি যা তার ভাবের জগতে এক অন্য জগতের ছাপ। তা হোক মূর্ত কিংবা বিমূর্ত চিত্র; দ্বিমাত্রিক তলে নান্দনিক গল্পের চলমান রেখা। 

picture

পল ক্লি'র চিত্রকর্ম 'Insula Dulcamara' 

শিল্পী পল ক্লি সারাজীবনে ১০,০০০ এরও বেশি পেইন্টিং ড্রয়িং ও ছাপচিত্রের কাজ করেন। এর মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হলো- মেশিন (১৯২২), ফিস ম্যাজিক (১৯২৫), ভিয়েডাকস্ ব্রেক র‌্যাঙ্ক (১৯৩৭)। 

এই মহান শিল্পী ২৯ জুন, ১৯৪০ সালে সুইজারল্যান্ডে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। আপন সমাধিলিপির জন্য যে কথাগুলো তিনি লিখে গিয়েছিলেন তা তীব্রতম অর্থবহতায় ব্যঞ্জনাময়- “আমাকে ধরে রাখা যায় না- না এখানে, না এখন। কেননা আমি অত্যন্ত স্বস্তিতে রয়েছি মৃতদের সঙ্গে, যেমন যারা জন্ম নেয়নি তাদের সঙ্গেও সান্নিধ্যে অথচ তার চেয়েও অনেক অনেক দূরে।” 

তথ্যসূত্র- 

১. Paul Klee by Will Grohmann.
২. The German Expressionists by Frederick A. Praeger.
৩. A Concise History of Modern Fainting by Herbert Read: Thames and
Hudson.
৪. শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য- সৈয়দ আলী আহসান।
৫. পল ক্লি আর্কাইভ- জেনা বিশ্ববিদ্যালয়।

ওডি/এনএম 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড