জেনারেশন গ্যাপ এবং একটি সোনার পাহাড়ের গল্প

প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০১৮, ১০:০৯

  আসিফ রহমান

জেনারেশন গ্যাপ একটি মারাত্মক জিনিস। আমরা যেমন আমাদের মা-বাবার চিন্তাধারার সাথে কুলিয়ে উঠতে পারিনা, তেমনি বাবা-মা'রাও ঠিক আমাদের একটা সময় পর বুঝতে পারেন না। এই বুঝতে না পারাটাই আমরা বুঝতে পারি না বলে একসময় দূরত্ব সৃষ্টি হয়, এবং সম্পর্কে ফাটল ধরে।

আমরা বর্তমান জেনারেশন আসলে কি চাই?

আমরা চাই নিজেদের মতো চলতে। একটু-আধটু স্বাধীনতা, একটু আবেগ, এক-আধটু নিজেকে হারিয়ে ফেলে আবার নিজেকে খুঁজে পেতে। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা সবাই 'আমি' হতে চাই। আমি হতে গিয়ে আমরা পূর্ববর্তী জেনারেশনের সবকিছুকে উল্টে দিতে চাই। মনে করি, তারা ব্যাকডেটেড। তাদের সিস্টেম, তাদের ইচ্ছে, তাদের কাজ, সবকিছুই বর্তমান সময়ের থেকে বেশ পিছিয়ে। তাদের আমাদের জীবনে কোনো প্রয়োজন নেই। এই 'আমি' হতে গিয়ে আমরা শেকড় থেকে আমাদের উপড়ে ফেলি। শেকড় বলতে পরিবার, বাবা-মা। তারপর কোনোরকম ভঙ্গুর নদীর কিনারে নতুন শেকড় গেড়ে বলি, আহ! এই জীবনই তো আমরা চেয়েছিলাম।

আমাদের পূর্ববর্তী জেনারেশন আসলে কি চায়?

তারা চায় আমরা যাতে সঠিক পথে চলি, জীবনে চলার পথে সঠিক জীবনসঙ্গী নির্বাচন করি যে কিনা ঠিক তাদের মতো করে আমাদের নিয়ে ভাববে। তাদের মতো করে সবকিছু আগলে রাখবে, ভালোবাসবে। এই 'তাদের' কিংবা 'আমি' থেকে তৈরী হয় জেনারেশন গ্যাপ। আমরা হারিয়ে ফেলি আমাদের শেকড়, তারা হারিয়ে ফেলে তাদের শাখা-প্রশাখা। শাখা-প্রশাখা হারিয়ে তাদের হয়তো তেমন কিছুই হয় না, কিংবা হয়; কিন্তু শেকড় হারিয়ে আমাদের অনেক কিছু হয়ে যায় আমরা টের পাই না।

ফলশ্রুতিতে তারা যেমন জীবন কাটান একাকীত্বে, তেমনি আমরাও ভেতরে ভেতরে বিষণ্ণতা আর জীবনের ভারে নুয়ে নুয়ে কোনোরকম জীবন কাটিয়ে দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করি। অথচ, কেউই ভাবি না, অন্যজন কি চায়? কেন এই জেনারেশন গ্যাপ তৈরী হয়? কেনই বা এর থেকে মুক্তির রাস্তা থাকে না?
না, আমি বাবা-মা নিয়ে ইমোশনাল কিছু বলতে আসিনি! আমি জানি আমার ইমোশন তেমন একটা কাজ করে না, আমি জানি সুযোগ পেলে আমিও সবকিছু ফেলে, সব সম্পর্ক ছিন্ন করে উড়াল দিতে এক মুহূর্তও দেরি করব না। কেননা আমি বিশ্বাস করি আমার বাবা-মা কখনো আমাকে বুঝতে পারা তো দূর, বুঝতেও চাননি। এটাই তো গ্যাপ। জেনারেশন গ্যাপ।

ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ থাক।

সিনেমার প্রসঙ্গে আসি।

একজন স্বাধীনচেতা বয়স্ক মহিলা, যিনি তার পুত্রের বউকে সহ্য করতে পারেন না। তাকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন। ফলে ধীরে ধীরে ছেলের সাথেও তার সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে এবং এক সময় ছেলে তার বউকে নিয়ে চাকরির সুবাদে অন্য জায়গায় থাকতে শুরু করে। মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব ছেড়ে দেয় কাজের লোকের হাতে।

হুট করে একদিন ঘটনাক্রমে সেই মহিলার জীবনে একটি ছেলে আসে! এসে বলে, তার এইডস!
ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ছেলেটির এইডস নেই, সে মারের হাত থেকে বাঁচার জন্যই এটা বলে থাকে। সে জানে, এইডস বললে কেউ তাকে মারা তো দূর, ধারেকাছে ঘেঁষতেও সাহস করবে না।

এখানে আবার চিত্রনাট্যকার সূক্ষ্মভাবে এইডস নিয়ে আমাদের নিচুতলার মানুষদের একটি নেতিবাচক ধারণাকে উপস্থাপন করেছেন।
মহিলাটির নতুন জীবন শুরু হয়। যেমন করে নিজের ছেলেকে মানুষ করেছিলো, ঠিক সেভাবেই ইতিহাস নিজেকে রিপিট করে।
তারপর একদিন, কোনো এক আটকে থাকা গল্পের পাতা থেকে ডাক এলো, সোনার পাহাড়ের ডাক!

কিন্তু কোথায় সেই সোনার পাহাড়?

কেনই বা ডাকে সে?

জেনারেশন গ্যাপের অসমাপ্ত গল্পের শেষটাই বা কিভাবে সোনার পাহাড়ের কথা বলছে?

বুড়ো মহিলাটির অভিনয় মারাত্মক ছিলো। ঠিক যেমন বাস্তবে রূঢ় চাহনি কিংবা অভিব্যক্তির মানুষগুলোকে দেখা যায়, ঠিক সেরকম। প্রথমদিকে তো ভয়ই লাগছিলো মহিলাকে!

পিচ্চিটাও জাস্ট ওয়াও! 

যীশুকে নিয়ে তো আর বলার কিছু নেই। পুরো কলকাতার বাজার এখন যীশুর দখলে।

পরমব্রত যে একজন অভিনেতার পাশাপাশি দক্ষ পরিচালকও সে বিষয়ে আমার সন্দেহ কোনোকালেই ছিলো না। অভিনেতা হিসেবে এই সিনেমায় তিনি অ-গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করলেও পরিচালক হিসেবে মুন্সিয়ানার পরিচয়ই দিয়েছেন। আর গল্প হিসেবেও বেছে নিয়েছেন আমাদের ঠিক ঘরের গল্পটাকে!

সোনার পাহাড় প্রতিনিয়ত ডাকছে! পথ খুঁজে নিতে হবে আমাদের। যে পথ আমাদের ঠিকই পৌছে দেবে জেনারেশন গ্যাপের এক অভিন্ন মোহনায়...