• বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন

মুভি রিভিউ

রাজকাহিনীর ডানায় ৪৭ এর দেশভাগ; বন্ধুত্ব, ধর্ম নাকি অস্তিত্ব?

  আসিফ রহমান ২৭ অক্টোবর ২০১৮, ১২:৫৩

'রাজকাহিনী'
'রাজকাহিনী' সিনেমার একটি পোস্টার

রাজকাহিনীর গল্পটি একটি সমাজের। প্রচলিত সমাজের বাইরে অন্যরকম একটি সমাজের। যে সমাজের নাম কোঠাবাড়ি, বাঈজীখানা কিংবা পতিতালয়। 

এই গল্পের কোঠাবাড়ির বাবা-মা বলতে যে আছে তার নাম বেগমজান। বারবনিতাদের সর্দার। বিয়ের পর কম বয়সে বিধবা, এরপর কেউ একজন তাকে বিক্রি করে দেয় কোনো এক বেশ্যাখানায়। কিন্তু সে সেখান থেকে বেরিয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে বাঈজী হিসেবে নাম কামায়। তারপর পড়ন্ত বয়সে এসে এই কোঠা খুলে বসে নিজের জন্য, নিজেদের জন্য। 

বারবনিতাদের কোনো জাত-ধর্ম নেই! শরীরই তাদের ধর্ম। শরীরই তাদের জীবন। কিন্তু তাদের জীবনে ঝড়ের মতো আঘাত হানে ৪৭ এর দেশভাগ।

দেশভাগের প্রাক্কালে হিন্দু-মুসলিস দাঙ্গা ফেঁপে উঠে। সেই সুযোগে পুরো ভারতবর্ষে চলে ধর্ষণের দামামা। যে যাকে, যেখানে পারে, ধর্ষণ করে ফেলে রেখে যায়। 

একটি কথোপকথনে বিষয়টি আরেকটু স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়..

‘মাসিমা কেমন আছে কুসুম?’ 
‘ভালো, রেপড হয়নি একটুর জন্য!’ 

১৯৪৭ সালের দেশভাগ। রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে ভারতবর্ষ ভেঙে বর্তমান ভারত এবং পাকিস্তান নামে দুটি দেশের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। যদিও এটাকে অনেক ইতিহাসবিদই রাজনৈতিক কারণ বলতে নারাজ। তাদের মতে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যেন আর না হয়, সেজন্যই হিন্দুদের জন্য ভারত আর মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান নামের একটি দেশের সৃষ্টি হয়েছিলো।

এর ফলে ৪৭ এর ১৫ আগষ্ট নতুন দুটি দেশের জন্মের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে।

গল্প তখনও শুরু হয়নি। ভারত, পাকিস্তানের সীমানা ভাগ হওয়ার বদৌলতে ১ কোটি ৪০ লক্ষ ভিন্ন ধর্মের মানুষকে তাদের নিজের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়। বিভাজনের প্রাক্কালে ধর্ষণ আর তার প্রতিশোধে ধর্ষণ এতটা মারাত্মক আকার ধারণ করে যে, যা ভারতবর্ষে ঘটে যাওয়া পূর্বের সকল দাঙ্গার বিভৎসতাকে ছাড়িয়ে যায়।

কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের ক্ষমতা আর ধর্মের ডামাডোলে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে পড়ে অতিষ্ঠপ্রায়। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যে কোনো মূল্যে দেশভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শুধুমাত্র তার সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে।

তাদের সেই সিদ্ধান্তে অন্যদের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাজকাহিনীর দুই বন্ধু। যারা কিনা ছোটবেলায় একসাথে বড় হয়েছে। এক অফিসে কাজ করেছে, তারা এখন হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার জন্য, দেশ বিভাজন হওয়ায় একে অপরের শত্রু। একজন কংগ্রেসের আর আরেকজন মুসলিম লীগের। 

দেশভাগের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর এই দুই দেশের দুই প্রতিনিধির ওপর দায়িত্ব পড়ে হিন্দুস্তান, পাকিস্তানের বর্ডারের কাঁটাতার বসানোর কাজটির প্রতিনিধিত্ব করার। 

কিন্তু যে ম্যাপ দেওয়া হয় সরকার থেকে, সে অনুযায়ী কাঁটাতার বসাতে হলে, সেটি চলে যায় বেগমজানের কোঠার মাঝ বরাবর দিয়ে। 
এ দিকে বেগমজান তার কোঠা ছাড়তে নারাজ। সে সাহায্য চায় রংপুরের নবাবের কাছে।

কোঠা নিয়ে দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে চলে যায় বাঁচা-মরার লড়াইয়ে!

‘রাজকাহিনী’ সৃজিতের নিখুঁত একটি কাজ। ইতিহাসের এত বড় একটি ঘটনাকে এরকম অসাধারণভাবে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন চাট্টিখানি কথা নয়। সৃজিত সেটি এতো ভালোভাবে করেছেন যে, সিনেমা যেন হয়ে উঠেছে বাস্তবের বিমূর্ত প্রতিবিম্ব। শৈল্পিকভাবে ধর্ষণের ব্যাপারটির দৃশ্যায়ন প্রথমেই গায়ে কাঁপন ধরিয়ে দেবে দর্শকদের। মনে হবে, ঘটনাটি যেন চোখের সামনে ঘটছে। পাশাপাশি ক্ষুরধার সংলাপ, সিনেমাটোগ্রাফি, কালার গ্রেডিং, আবহ সঙ্গীত, প্রতিবিম্বের মাধ্যমে পরিস্থিতি, আবেগ বিশ্লেষণ, ক্যারেক্টার বিল্ডআপ, সবকিছুই যেন ছিল আপ-টু-মার্ক।

এ সিনেমায় চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, আবির চ্যাটার্জি, শ্বাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক সেন, যীশু সেনগুপ্ত, পর্নো মিত্র, রুদ্রনীল, সোহিনী সরকার, কাঞ্চন মল্লিক, প্রিয়াঙ্কা সরকার, সায়নী ঘোষ, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, রজতাভ দত্ত,  লিলি চক্রবর্তী এবং বাংলাদেশের প্রখ্যাত অভিনেত্রী জয়া আহসান।

পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় রাজকাহিনীকে তার জীবনের সেরা পরিচালনা বলে অভিহিত করেছেন। এর পাশাপাশি এ সিনেমার প্রশংসা করতে গিয়ে বলিউডের মহেশ ভাট বলেছিলেন, রাজকাহিনী নিঃসন্দেহে এ সময়কার সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত সিনেমা।

উল্লেখ্য, রাজকাহিনী মুক্তির দুই বছরের মাথায় 'বেগমজান' নামে বিদ্যা বালানকে প্রধান চরিত্রে রেখে রাজকাহিনীর রিমেক বলিউডেও মুক্তি পায়।
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড