• বুধবার, ২৭ মার্চ ২০১৯, ১৩ চৈত্র ১৪২৫  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন

লালন তোমার আরশীনগর, আর কতদূর…

নাবিলা বুশরা  
১৪ অক্টোবর ২০১৮, ১১:০৩

লালন শাহ
লালন শাহ

বাউল সম্রাট লালন সাঁই গড়াই সেই কবে কোলে করে বয়ে এনেছিলে তাঁরে
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাববাদী দরবেশ
তাঁকে ঘুম পাড়ায়ে রেখেছো কালীগাঙের পাড়ে
এক তারাতে যার সুর আজ জাগায় বাংলাদেশ।

গড়াই নদীর কোলে করে কে এসেছিল? কাকে জানা হয় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাববাদী দরবেশ হিসেবে? কালীগাঙের পাড়ে ঘুমিয়ে আছেন কে? কার এক তারার সুরেই বা  বাংলাদেশ জাগে? 

এই চার প্রশ্নের জবাব একজনের নামেই। তিনি বাউল সম্রাট লালন শাহ্‌। 

লালন শাহ এর আরেক নাম ফকীর লালন সাঁই। শিষ্যদের কাছে তিনি পরিচিত সাঁইজী নামে।  

আজ থেকে প্রায় ২৩৫ বছর আগে ১৭৭৪ সালে আজকের এ দিনে (১৪ অক্টোবর)  লালন শাহ কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ভাঁড়রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তখন এই জায়গাটি কুষ্টিয়া জেলা হিসেবে পরিচিত ছিল না। অবিভক্ত ভারতবর্ষেও নদীয়া জেলার অন্তর্গত মহকুমা ছিল। আর কুমারখালী ছিল ইউনিয়ন। 

লালন গড়াই নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ভাঁড়রা গ্রামের হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন শ্রী মাধব কর আর মা ছিলেন শ্রীমতি পদ্মাবতী। লালন বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান ছিলেন। শৈশবেই লালন তার বাবাকে হারান। একমাত্র মায়ের আদর স্নেহে বেড়ে ওঠেন তিনি। 

পরিবারের প্রধান বাবা বেচে না থাকায় সংসারের দায় দায়িত্ব পড়ে লালনের কাঁধে। মা ছাড়া তখন তার আর পৃথিবীতে কেউ ছিল না। মায়ের সেবার কথা ভেবে লালন সংসার জীবন শুরু করেন।  

লালন ব্যক্তি জীবনে ছিলেন নীতিবান। পরিবারের অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের সাথে তার বনিবনা না হওয়ায় মা ও স্ত্রীকে নিয়ে একই গ্রামের দাসপাড়ায় নতুন করে বসতি গড়েন। সংসার চালাতে গিয়ে লালনের আর লেখাপড়ার সুযোগ হয়নি। তবে তিনি শৈশব থেকেই ছিলেন গান বাজনার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। ভাঁড়রা গ্রামে কবিগান,পালাগান,কীর্তনসহ নানা রকম গানের আসর বসতো। লালন সেই আসরের একজন প্রিয়জন ছিলেন। তার গান শুণে মানুষ মুগ্ধ হতো।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজ সাধনাবলে তিনি হিন্দু মুসলমান উভয় ধর্মের শাস্ত্র সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। তার রচিত গানে সেই জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। আধ্যাত্মিক ভাবধারায় তিনি প্রায় দু’হাজার গান রচনা করেন। তার গান মরমি ব্যঞ্জনা ও শিল্পগুণে সমৃদ্ধ। সহজ  সরল শব্দময় অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্মস্পর্শী তাঁর গানে মানব জীবনের আদর্শ, মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।

লালন কোনো জাতিভেদ মানতেন না। তাই তিনি গেয়েছেন: ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে লালন কয় জাতির কি রূপ দেখলাম না এ নজরে।’ এরূপ সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিমুক্ত এক সর্বজনীন ভাবরসে সিক্ত বলে লালনের গান বাংলার হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নিকট সমান জনপ্রিয়। তার ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘বাড়ির কাছে আরশীনগর’, ‘আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে’ ইত্যাদি গান বাউল তত্ত্বসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।

বাংলা ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত ‘মাসিক মোহম্মদী’ পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লালনের জন্ম মুসলিম পরিবারে বলে উল্লেখ করা হয়। আবার ভিন্ন তথ্যসূত্রে তার জন্ম হিন্দু পরিবারে বলে উল্লেখ করা হয়।

লালনের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন,

‘‘লালন ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু কোনো বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনে আগ্রহী ছিলেন না। সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন জীবনে।’’

লালনের পরিচয় দিতে গিয়ে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন,

‘‘কাঙাল হরিনাথ তাকে জানতেন, মীর মশাররফ চিনতেন, ঠাকুরদের হাউসবোটে যাতায়াত ছিল, লেখক জলধর সেন বা অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তাকে সামনাসামনি দেখেছেন কতবার, গান শুনেছেন, তবু জানতে পারেননি লালনের জাতপরিচয়, বংশধারা বা ধর্ম।”

একটি গানে লালনের প্রশ্ন :

‘‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে।। ”

কিছু লালন অনুসারী যেমন মন্টু শাহের মতে, তিনি হিন্দু বা মুসলমান কোনোটিই ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন ওহেদানিয়াত নামক একটি নতুন ধর্মীয় মতবাদের অনুসারী। ওহেদানিয়াতের মাঝে বৌদ্ধধর্ম এবং বৈষ্ণব ধর্মের সহজিয়া মতবাদ, সুফিবাদসহ আরও অনেক ধর্মীয় মতবাদ বিদ্যমান। লালনের অনেক অনুসারী লালনের গানসমূহকে এই আধ্যাত্মিক মতবাদের কালাম বলে অভিহিত করে থাকে।

লালনের আখড়া

লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়াতে একটি আখড়া তৈরি করেন, যেখানে তিনি তার শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন। তাঁর শিষ্যরা তাঁকে “সাঁই’’ বলে সম্বোধন করতেন। তিনি প্রতি শীতকালে আখড়ায় একটি ভান্ডারা (মহোৎসব) আয়োজন করতেন। যেখানে সহস্রাধিক শিষ্য ও সম্প্রদায়ের লোক একত্রিত হতেন এবং সেখানে সংগীত ও আলোচনা হত। চট্টগ্রাম, রংপুর, যশোর এবং পশ্চিমে অনেক দূর পর্যন্ত বাংলার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বহুসংখ্যক লোক লালন ফকিরের শিষ্য ছিলেন; শোনা যায় তার শিষ্যের সংখ্যা প্রায় দশ হাজারের বেশি ছিল। 

লালন

দর্শন

লালনের গানে মানুষ ও তার সমাজই ছিল মুখ্য। লালন বিশ্বাস করতেন সকল মানুষের মাঝে বাস করে এক মনের মানুষ। আর সেই মনের মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় আত্মসাধনার মাধ্যমে। দেহের ভেতরেই মনের মানুষ বা যাকে তিনি অচিন পাখি বলেছেন, তার বাস। সেই অচিন পাখির সন্ধান মেলে পার্থিব দেহ সাধনার ভেতর দিয়ে দেহোত্তর জগতে পৌঁছানোর মাধ্যমে। আর এটাই বাউলতত্ত্বে 'নির্বাণ' বা 'মোক্ষ' বা 'মহামুক্তি' লাভ। তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানবতাবাদকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন।

তার বহু গানে এই মনের মানুষের প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন মনের মানুষ এর কোন ধর্ম, জাত, বর্ণ, লিঙ্গ, কূল নেই। মানুষের দৃশ্যমান শরীর এবং অদৃশ্য মনের মানুষ পরস্পর বিচ্ছিন্ন, কিন্তু শরীরেই মনের বাস। সকল মানুষের মনে ঈশ্বর বাস করেন।লালনের এই দর্শনকে কোন ধর্মীয় আদর্শের অন্তর্গত করা যায় না।

লালন, মানব আত্মাকে বিবেচনা করেছেন রহস্যময়, অজানা এবং অস্পৃশ্য এক সত্তা রূপে। খাঁচার ভিতর অচিন পাখি গানে তিনি মনের অভ্যন্তরের সত্তাকে তুলনা করেছেন এমন এক পাখির সাথে, যা সহজেই খাঁচা রূপী দেহের মাঝে আসা যাওয়া করে কিন্তু তবুও একে বন্দি করে রাখা যায় না। 

লালনের সময়কালে যাবতীয় নিপীড়ন, মানুষের প্রতিবাদহীনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি-কুসংস্কার, লোভ, আত্মকেন্দ্রিকতা সেদিনের সমাজ ও সমাজ বিকাশের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সমাজের নানান কুসংস্কারকে তিনি তার গানের মাধ্যমে করেছেন প্রশ্নবিদ্ধ। আর সে কারণেই লালনের সেই সংগ্রামে বহু শিষ্ট ভূস্বামী, ঐতিহাসিক, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, লেখক এমনকি গ্রামের নিরক্ষর সাধারণ মানুষও আকৃষ্ট হয়েছিলেন ।

লালন

আধ্যাত্মিক ভাবধারায় তিনি প্রায় দুই হাজার গান রচনা করেছিলেন। তার সহজ-সরল শব্দময় এই গানে মানবজীবনের রহস্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। লালনের বেশ কিছু রচনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তিনি ধর্ম-গোত্র-বর্ণ-সম্প্রদায় সম্পর্কে অতীব সংবেদনশীল ছিলেন। 

ব্রিটিশ আমলে যখন হিন্দু ও মুসলিম মধ্যে জাতিগত বিভেদ-সংঘাত বাড়ছিল তখন লালন ছিলেন এর বিরূদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি মানুষে-মানুষে কোনো ভেদাভেদে বিশ্বাস করতেন না। মানবতাবাদী লালন দর্শনের মূল কথা হচ্ছে মানুষ। আর এই দর্শন প্রচারের জন্য তিনি শিল্পকে বেছে নিয়েছিলেন। 

লালনকে অনেকে পরিচয় করিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন সাম্প্রদায়িক পরিচয় দিয়ে। কেউ তাকে হিন্দু, কেউ মুসলমান হিসেবে পরিচয় করাবার চেষ্টা করেছেন। লালনের প্রতিটি গানে তিনি নিজেকে ফকির (আরবি "সাধু") হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

লালন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন:

“লালন ফকির নামে একজন বাউল সাধক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেন - আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।”

যদিও তিনি একবার লালন 'ফকির' বলেছেন, এরপরই তাকে আবার 'বাউল' বলেছেন, যেখানে বাউল এবং ফকিরের অর্থ পারস্পরিক সংঘর্ষিক।

সাধক পুরুষ লালন শাহ্‌ সাধু দরবেশ হওয়া সত্বেও সংসার বিবাগী হননি। সংসারের প্রতি তার দারুন টান ছিল। এক মুসলিম মহিলা বয়ানকারীনির সাথে তিনি নিকাহ করেন এবং ভক্তদের দেওয়া জায়গায় পানের বরজ করেন সংসার চালানোর জন্য। এছাড়াও তিনি মৃত্যুর আগে তার পালিত কন্যা পিয়ারীর সাথে ভোলাই শাহ্‌’র বিবাহ সম্পন্ন করান। এ থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায় তিনি কন্যার বিয়ে, সংসারের জন্য পানের বরজ এসবই সংসারের প্রতি তার ভালবাসার নিদর্শন মাত্র।

১৮৯০সালের ১৭ অক্টোবর (১২৯৭ সালের ১ কার্তিক) শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টায় ১১৬ বছর বয়সে বাঙলা আর বাঙালীর হৃদয়ের মানুষ বাউল সম্রাট মরমী সাধক লালন শাহ্‌ ইন্তেকাল ত্যাগ করেন। যেদিন ভোরে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ঐ দিনও সারারাত ধরে আখড়ায় বাউল গান নিয়ে শিষ্য ভক্তদের সময় দিয়েছেন। ভোর ৫টায় তিনি সকল ভক্তদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন “আমি চলিলাম”। এই কথার আধা ঘণ্টা পর তিনি সকলকে কাঁদিয়ে সত্যি সত্যিই একেবারে চলে যান।

মননে-মানসে মানব মুক্তির গান ধারণ করা মানুষটি কখনও বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্তভাবে আবার কখনোবা সংঘবদ্ধভাবে বাউল গান মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিয়েছেন। তৈরি করেছেন অসংখ্য ভক্ত আর শিষ্য। 

গ্রামের অবহেলিত লালনের সে একতারার সুর যেন আজও বাংলাদেশকে জাগিয়ে তোলে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজও তার দর্শন নিয়ে গবেষণা চলছে। লালনের সে উৎসের সন্ধানে আজও যেন বাউল গেয়ে যাচ্ছে-  

লালন তোমার আরশীনগর
আর কতদূর…আর কতদূর…
 

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড