• সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

তারেক মাসুদ : এক সিনেমাওয়ালার গল্প

নাবিলা বুশরা  
১৩ আগস্ট ২০১৮, ১৬:৩৯

তারেক মাসুদ

সিনেমাকে জানা হয় সমাজের প্রতিফলন হিসেবে। বাংলাদেশের কতগুলো সিনেমায় সমাজের এমন প্রতিফলন ঘটেছে তা হাতে গুণে বলে দেওয়া যায়। এর মূল কারণ এমন সিনেমা দেশে খুব বেশি হয় না। খুব সচেতনভাবে যারা সমাজের বাস্তবতাকে সিনেমায় তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তাদের ভেতর তারেক মাসুদ অন্যতম একজন। 

তারেক মাসুদ শুধু একজন সিনেমার কারিগরই নন, সিনেমার ফেরিওয়ালাও। জীবনের রং, গল্প জেনে বুঝে তিনি সিনেমা বানাতেন। আবার সেই সিনেমা সবাইকে দেখানোর জন্য ছুটে বেড়াতেন দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, কখনোবা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরে। এক কথায় তিনি ছিলেন এ-অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সুতা ধরে নেমে আসা এক বায়োস্কোপঅলা।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যখন খরা চলছিল, এক মৃতপ্রায় অবস্থা ঠিক তখনই  সিনেমাপাগল এক তরুণ তার সিনেমার ঝুলি নিয়ে ঘুরছেন দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে। বাণিজ্যিক ছবির এই দাপুটে বাজারে দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে মানুষটি এ দেশের চলচ্চিত্রকে আক্ষরিক অর্থেই শিল্প বানাতে চেয়েছিলেন।

দেশের তরুণ-বৃদ্ধ সবার আত্মার মুক্তি ঘটবে এমনটাই ভেবেছিলেন তিনি। শিল্পসত্ত্বার দায়বদ্ধতা সাথে নিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্ব দরবারে একটা উচ্চ স্থান দেওয়ার জন্য আমৃত্যু কাজ করে গেছেন সেলুলয়েডের এই কবি। 

ফরিদপুর জেলার নূরপুর গ্রামে ১৯৫৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর তারেক মাসুদের জন্ম। তাঁর ছাত্রজীবনের শুরুটা হয়েছিল মাদ্রাসায় ইসলামী শিক্ষালাভের মধ্য দিয়ে। ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে তার পড়াশোনায় ছেদ পড়ায় ঢাকা এসে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে এরপর নটরডেম কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরেই তিনি চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। 

দেশে তিনিই প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলনের সূচনা করেন। আরেক কিংবদন্তী মেধাবী সিনেমা নির্মাতা আলমগির কবির ছিলেন তাঁর সিনেমাগুরু। আহমদ ছফার বিশেষ ভক্ত ছিলেন তিনি।

তারেক মাসুদের তৈরি সিনেমা নিয়ে কিছু কথা- 

অনন্য প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’ 

তারেক মাসুদের প্রথম কাজ ‘আদম সুরত’ (দ্য ইনার স্ট্রেংথ)। এটি মূলত এস এম সুলতানের উপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র। ১৯৮২ সালে শুরু হওয়া প্রামাণ্যচিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৮৯ সালে। আদম সুরত ধারণ করা হয় চিত্রাপাড়ে। এটি নিয়ে তারেক মাসুদ বলেছিলেন, “চিত্রা নদীর পাড়ে থাকেন চিত্রশিল্পী সুলতান। আমরা যখন সুলতান ভাইয়ের উপর ছবি বানাতে আসলাম তখন চিত্রাই হয়ে গেলো সমস্ত কিছুর কেন্দ্রবিন্দু।” 

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োগ্রাফিকাল সেন্টার সুলতানকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ সম্মাননায় ভূষিত করে। এস এম সুলতানের আঁকা ছবি স্থান পেয়েছে পিকাসো, সালভাদর দালির মতো শিল্পীদের আঁকা ছবির সঙ্গে একই প্রদর্শনীতে। তিনি শুধুই যে চিত্রশিল্পী ছিলেন তা নয়, অদ্ভুত ছিল তাঁর জীবনধারণের উপায়। নিজের শিল্পের প্রতি সৎ থাকার জন্য ছেড়েছেন সংসারের সকল আরাম, আয়েশ। সারা জীবন একা থাকা এ অসামান্য মানুষটির সঙ্গ পেয়ে তারেক মাসুদের নিজের জীবনবোধও পাল্টে গিয়েছিল। 

১৯৮৫ তাঁর নির্মাণ করা ‘সোনার বেড়ী’ নামের আরেকটি প্রামাণ্যচিত্রতে এদেশের সমকালীন নারীদের আর্থসামাজিক অবস্থান এবং সেই অবস্থানে তাদের অধিকার ও ভূমিকার বিষয়টা খুব সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। প্রামাণ্যচিত্র হওয়ায় ‘আদম সুরত’ ও ‘সোনার বেড়ী’ বোদ্ধাদের প্রশংসা পেলেও জনপ্রিয়তার কাতারে দাঁড়াতে পারেনি। 

মুক্তির গান ও মুক্তির কথা 

’৭১ এর যুদ্ধের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা সহ বিভিন্ন কারণে ‘৭৫ এর দিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনেকটাই ম্রিয়মাণ হয়ে গিয়েছিল। ১৯৯৫ সালে তারেক মাসুদের তৈরি ‘মুক্তির গান’ সেই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়া চেতনাকেই যেন উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিল। 

‘মুক্তির গান’ তৈরির পিছনে খুব চমকপ্রদ একটা গল্প আছে। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিন বাংলাদেশে এসে একদল পথশিল্পীদের নিয়ে ট্রাকে করে ঘুরে বেড়িয়েছেন গেরিলা ক্যাম্প, শরণার্থী শিবির এবং হাসপাতালগুলোতে। পথশিল্পীদের সেই দলটি মুক্তির গান গাইত। লেভিন তাঁর ক্যামেরায় এসব ফুটেজ ধারণ করে রাখেন। যুদ্ধের পরে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান লেভিন। প্রায় দু’দশক পরে ১৯৯১ সালে তারেক মাসুদের সাথে লেভিনের দেখা হয়। তারেক মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ এই ফুটেজগুলো নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের আগ্রহ প্রকাশ করেন। লেভিনও রাজি হয়ে যান সানন্দেই। 

‘মুক্তির গান’ আসলে তৎকালীন মুক্তির চেতনাকে জাগ্রত করার জন্য অনেক বড় একটা প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তারেক মাসুদ আর ক্যাথরিন মাসুদের। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের উপর ভিত্তি করেই তারেক মাসুদ তৈরি করেন ‘মুক্তির কথা’ ও ‘ নারীর কথা’ নামের আরো দুটি প্রামাণ্যচিত্র।

অসাধারণ ‘মাটির ময়না’

২০০২ সালে নির্মিত ‘মাটির ময়না’ নিঃসন্দেহে তারেক মাসুদের তৈরি অন্যতম সেরা কাজ। ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘মাটির ময়না’ জিতে নেয় ‘ফিপরেস্কি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিকস প্রাইজ’। এছাড়াও অস্কারে ‘সেরা বিদেশী ভাষার ছবি’ ক্যাটাগরিতে প্রথম বাংলাদেশী সিনেমা হিসেবে ‘মাটির ময়না’কে মনোনয়ন দেওয়া হয়। 

‘মাটির ময়না’র গল্পে ষাটের দশকের বাংলাদেশ, মানুষের জীবন এবং মুক্তিযুদ্ধে ইসলামের প্রভাব দেখা যায়। সিনেমায় সমাজের নারী-পুরুষ ভেদাভেদ, কাঠমোল্লাদের দৌরাত্ম্য, অন্ধ বিশ্বাস আর লোক দেখানো আচারের বিভিন্ন দিক দেখানো হয়েছে।   

বাস্তবধর্মী এক সিনেমার নাম ‘রানওয়ে’ 

প্রায় ৯০ মিনিট দৈর্ঘ্যের বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্র ‘রানওয়ে’ তে সুনিপুণভাবে ২০০৫-০৬ সালের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরেন তারেক মাসুদ।

চলচ্চিত্রটিতে তিনি ধর্মের লেবাসে থাকা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। সিনেমার গল্প দর্শককে দেখানোর সময় তিনি আগ্রাসী ভাব না নিয়ে নম্রভাবে বলেছেন। সিনেমাটি দেখেই বুঝতে পারা যায় তারেক মাসুদের সিনেমা বোলার গল্প অন্য যে কোনো পরিচালক থেকে আলাদা। 

অন্তর্যাত্রা 

এই সিনেমাতেও আপাতদৃষ্টিতে জঙ্গি, মৌলবাদী কিংবা অস্তিত্বহীন চরিত্রগুলোর পেছনের গল্প তুলে এনেছেন তিনি, দেখিয়েছেন পারিপার্শ্বিকতা কীভাবে তাদেরকে ভুল পথে নিয়ে গেছে। 

তারেক মাসুদ মানুষের জন্য সিনেমা বানাতেন। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সকল ক্ষুদ্র জিনিস থেকে তিনি তাঁর অফুরন্ত ভালোবাসার উৎস খুঁজে নিতে পারতেন।দেশের প্রতিটি মানুষ তাদের জীবনের স্বরূপ খুঁজে পাবে এমন এক স্বপ্ন নিয়েই সিনেমা বানিয়েছেন তারেক মাসুদ। 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড